(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বিশ্বের শীর্ষ বন্দরনগরীগুলোর দিকে তাকালে–সিঙ্গাপুর, রটারডাম, হামবুর্গ, বুসান কিংবা সাংহাই– একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। তারা শুধু বন্দর উন্নয়ন করেনি; তারা পুরো শহরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যাতে বন্দর, সড়ক, রেল, নগর পরিবহন, জনপরিসর এবং নাগরিক সেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। কারণ তারা জানে, একটি আধুনিক বন্দর শুধু জাহাজের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে পুরো শহরের দক্ষতার ওপর। চট্টগ্রামও যদি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক বন্দরনগরী হতে চায়, তাহলে নগর ব্যবস্থাপনাকে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
আমাদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফুটপাতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, জিইসি মোড়, দুই নম্বর গেইট, আন্দরকিল্লা, জামাল খান, চকবাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর – প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটপাতের বড় অংশই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা, ঠেলাগাড়ি বা অস্থায়ী স্থাপনার দখলে চলে যায়। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটে। এতে শুধু যানজটই বাড়ে না, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তবে এই সমস্যার সমাধান কেবল উচ্ছেদ অভিযান নয়। কারণ প্রতিটি হকারের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার এবং জীবিকার সংগ্রাম। সমাধান হতে হবে পরিকল্পিত, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতিবছর ‘পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড‘, ‘সবুজ ওয়ার্ড‘, ‘সেরা খাল ব্যবস্থাপনা‘, ‘সেরা করপোরেট সিটিজেন‘, ‘সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান‘ এবং ‘সেরা বাজার ব্যবস্থাপনা‘ পুরস্কার চালু করতে পারে। প্রতিযোগিতা মানুষকে পরিবর্তন করে। স্বীকৃতি দায়িত্ববোধকে উৎসাহিত করে। নগর উন্নয়ন শুধু আইন দিয়ে নয়, ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেও সম্ভব।
চট্টগ্রামকে আমরা প্রায়ই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলি। কিন্তু একটি শহর শুধু বাণিজ্যের জন্য মহান হয় না; মহান হয় তার নাগরিকদের দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং দূরদর্শিতার জন্য। আজ আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে নতুন করে ভাবার। আমরা কি এমন একটি চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে চাই, যেখানে বর্ষার বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা নয়; যেখানে খালগুলো আবার জীবন্ত হবে, ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, পার্কগুলো শিশুদের হাসিতে মুখর থাকবে, ওভারব্রিজগুলো ফুল ও সবুজে সজ্জিত থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিক পরিচ্ছন্নতাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করবে। আমি বিশ্বাস করি, এটি সম্ভব। কিন্তু তার জন্য আমাদের একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন – অভিযোগের সংস্কৃতি থেকে দায়িত্বের সংস্কৃতিতে উত্তরণ।
আমরা প্রায়ই বলি, সরকার কী করছে? হয়তো এখন সময় এসেছে আরেকটি প্রশ্ন করার–আমি কী করছি? আমি কি ডাস্টবিন ব্যবহার করছি? আমি কি খালে বা ড্রেনে প্লাস্টিক ফেলছি না? আমি কি একটি গাছ লাগিয়ে তার পরিচর্যার দায়িত্ব নিচ্ছি? আমি কি ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে? আমি কি সরকারি সম্পদকে নিজের সম্পদ বলে মনে করি? এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের চট্টগ্রাম কেমন হবে।
একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি সব সময় একটি বিষয় বিশ্বাস করি, ছোট ছোট শৃঙ্খলিত পদক্ষেপই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি। একটি ব্যাংক যেমন প্রতিদিনের হাজারো ছোট লেনদেনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি একটি শহরও দাঁড়িয়ে থাকে কোটি মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণের ওপর।
আজ আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি – নাগরিক, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ সংস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠন – সবাইকে একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শহর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি আমাদের সবার।
আমি এমন একটি চট্টগ্রামের স্বপ্ন দেখি, যেখানে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হবে সমন্বিত, একটি রাস্তা একবারই খোঁড়া হবে, খালগুলো হবে মুক্ত ও প্রবাহমান, প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকবে পরিকল্পিত সবুজ করিডর, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট নাগরিক হিসেবে নগর উন্নয়নের দায়িত্ব নেবে এবং শিশুদের বড় হওয়ার জন্য থাকবে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও প্রকৃতিনির্ভর পরিবেশ।
আমাদের সন্তানরা যেন একদিন গর্ব করে বলতে পারে, আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম শুধু উঁচু ভবন নির্মাণ করেনি; তারা একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত এবং বাসযোগ্য শহরও নির্মাণ করে গেছে। চট্টগ্রাম আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। শিক্ষা দিয়েছে, পেশা দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে। আমাদেরই চট্টগ্রাম। একে শুধু ব্যবহার করলেই চলবে না। একে ভালোবাসতে হবে। একে লালন করতে হবে। একে রক্ষা করতে হবে। কারণ একটি শহরও মানুষের মতো। যত্ন পেলে সে প্রাণ ফিরে পায়, অবহেলা পেলে ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য, সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলে। শেষ করার আগে আমি একটি কথাই বলতে চাই, চট্টগ্রাম আমাদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি অমূল্য সম্পদ। আমরা আজ যে চট্টগ্রাম রেখে যাব, আগামী প্রজন্ম ঠিক সেই চট্টগ্রামই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। আসুন, আমরা এমন একটি চট্টগ্রাম রেখে যাই, যা হবে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নান্দনিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ, জলাবদ্ধতামুক্ত এবং বিশ্বমানের একটি বন্দরনগরী।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক












