সুশিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধ

নেভী বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ৭ জুলাই, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

মানুষের শরীর যেমন মেরুদণ্ডের ওপর ভর করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি একটি জাতির উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। তবে শিক্ষা বলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা পুঁথিগত বিদ্যাকে বোঝায় না; স্বশিক্ষা ও সুশিক্ষার সমন্বয়েই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে।

স্বশিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, আর সুশিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সৎ, মানবিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এই সুশিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মাধ্যমে। যে সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তার চিন্তাভাবনা হয় উন্নত, বিবেক হয় জাগ্রত এবং মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয়। ফলে সে সহজে কোনো অনৈতিক বা অমানবিক কাজে জড়িয়ে পড়ে না। কারণ সুশিক্ষা মানুষকে সত্যবাদী, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও নৈতিক হতে শেখায়।

আচরণ মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। সুন্দর আচরণের মাধ্যমেই একজন মানুষ নিজের, তার পরিবারের এবং সমাজের পরিচয় বহন করে। ভালো আচরণ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং উন্নত ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটায়। তাই একটি পরিবারের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে তার সদস্যদের সুন্দর আচরণের মাধ্যমে।

সন্তানের মধ্যে সুন্দর আচরণ ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে অভিভাবক, বিশেষ করে বাবামায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। যেমনপরিবারের ভালোমন্দ বিষয় নিয়ে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা, পারস্পরিক শেয়ারিং ও কেয়ারিংএর মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা।

পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়ার টেবিলে বসে খাবার খাওয়া এবং সেই সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা করার অভ্যাস অত্যন্ত উপকারী। এতে বাবামা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সন্তানের মানসিক নৈকট্য বৃদ্ধি পায়, পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং সন্তানের মনোজগৎকে সহজে বোঝা ও সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

সন্তানের বয়স যাই হোক না কেন, মাবাবাকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে যাতে সে খারাপ সঙ্গের সংস্পর্শে না আসে। খারাপ সঙ্গই অধিকাংশ অপরাধ ও অনৈতিক আচরণের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় অপরাধ আড়াল করতে কিশোর বয়স থেকেই মিথ্যা বলার অভ্যাস গড়ে ওঠে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস একজন সন্তানকে বিবেকহীন ও অমানবিক আচরণের দিকে ঠেলে দেয় এবং সে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সন্তানের সামনে মাবাবার আদর্শ, জীবনাচরণ ও আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের লেখাপড়া, চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যবহার, সামাজিক সৌজন্যবোধ, খেলাধুলা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রতি যত্নশীল নজর রাখা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। এতে সন্তান সঠিক পথে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়; অন্যথায় ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু বাবামা সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাকচিক্য, অতিরিক্ত প্রদর্শন কিংবা নিজেদের পেশাগত সাফল্য অর্জনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে সন্তানের প্রকৃত শিক্ষা ও চরিত্র গঠন ব্যাহত হয়। তাই পেশাগত বা সাংগঠনিক সাফল্যের পাশাপাশি সন্তানের নৈতিক, মানবিক ও চারিত্রিক বিকাশের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

মাবাবার পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্ক, সকলের প্রতি দায়িত্বশীলতা, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে সততা, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সজ্জনদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ সন্তানের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। পারিবারিক শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, সততা, সহমর্মিতা ও উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি একজন সন্তানকে পরবর্তীতে আদর্শ, সুশিক্ষিত ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। কারণ সন্তান তার মাবাবার জীবনাচরণ থেকেই সর্বাধিক শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তাদের আদর্শ অনুসরণ করেই একজন সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠে।

একটি সুন্দর, আদর্শিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে আমাদের নিজেদের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। পরচর্চা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ও অহংকারের মতো নেতিবাচক প্রবণতা পরিহার করে বাস্তব জীবনবোধ, সহমর্মিতা ও নৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে।

আজকের সন্তানরাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার। তাই একটি আদর্শ, মানবিক ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক সুশিক্ষা ও মূল্যবোধের শিক্ষা অপরিহার্য। একমাত্র নৈতিক চেতনাই বর্বরতা, নৃশংসতা, খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, নারী নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক মূল্যবোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কাজেই, স্বশিক্ষা ও সুশিক্ষায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্মই পারে একটি নৈতিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে। ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজসবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই গড়ে উঠবে একটি শিক্ষিত, মূল্যবোধসম্পন্ন ও গৌরবান্বিত বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি আদর্শ মৃত্যুর জন্য নির্মল পরিবেশ চাই
পরবর্তী নিবন্ধপরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রামের প্রত্যয়