পবিত্র হজ আজ। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হবে আরাফাতের প্রান্তর। পবিত্র নগরী মক্কা ও মিনার আকাশ বাতাস এখন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত। আজ জোহর থেকে পরদিন ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করে মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা সুন্নত। এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুত তালভিয়া’ বলা হয়। এবার হজের সময় মক্কার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। সেজন্য সবাইকে ছাতা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্বেগ আর তীব্র গরমের মধ্যেই সৌদি আরবে শুরু হয়েছে হজের আনুষ্ঠানিকতা, যাতে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান। ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে হজ পঞ্চম স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিম নর–নারীর ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ বা আবশ্যিক। হজের অংশ হিসেবে তারা ৮ থেকে ১৩ জিলহজ মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় অবস্থান করবেন। এই যাত্রার শুরুতে গতকাল সোমবার তারা জড়ো হয়েছেন তাঁবুনগরী মিনায়। ভিড় এড়াতে কোনো কোনো মোয়াল্লেম (সৌদি আরবে যারা হজের ব্যবস্থাপনা করে দেন) রোববার এশার নামাজ পড়েই হজযাত্রীদের নিয়ে মিনার উদ্দেশে রওনা দেন। মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে মিনা।
ছয় দিন পর আবার তারা বাসায় ফিরবেন। তাই মিনায় থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হয়। পুরুষ হজযাত্রীরা মক্কার বাসায় অজু–গোসল সেরে সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় পরে হজের নিয়ত করেন। ইহরামের কাপড় (আড়াই হাত বহরের আড়াই গজ কাপড় আর গায়ের চাদরের জন্য একই বহরের ৩ গজ কাপড়) এক সেট পরে নিতে হয়, অতিরিক্ত আরেক সেট থাকে ব্যাগে।
এ ছাড়া এক সেট সাধারণ পোশাক (শার্ট–প্যান্ট অথবা পাঞ্জাবি–পায়জামা), পেস্ট, ব্রাশ, সাবান, চার্জারসহ মোবাইলফোন, কোরবানির কুপন (৭২০ রিয়ালে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক থেকে কুপন কিনতে হয়), মুজদালিফায় রাতে ঘুমানোর জন্য হালকা বিছানাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছোট ব্যাগে নিতে হয়। নিজের ব্যাগ নিজেকেই বহন করতে হয়, মোয়াল্লেম শুধু খাবারের ব্যবস্থা করেন। মক্কার আবহাওয়া দপ্তর ও সৌদি আরবের ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিটিরিওলজি (এনসিএম) পূর্বাভাস দিয়েছে, এবার হজের সময় মক্কার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। সেজন্য সবাইকে ছাতা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আরাফাতের ময়দানে সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজিরা দিতে ‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে বিদায় হজের স্মৃতি বিজড়িত এই ময়দান। আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত থাকাই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। সেখানে তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। আরাফাতের ময়দানের একপ্রান্তে মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর প্রধান ইমাম ও খতিব শায়েখ আলি বিন আবদুল রহমান আল–হুদাইফি। খুতবার পর হাজিরা একসঙ্গে যোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন। এবারের হজকে সামনে রেখে এ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেছে দুই পবিত্র মসজিদের ধর্মীয় বিষয়ক জেনারেল প্রেসিডেন্সি। এবার বিশ্বের মুসলমানদের জন্য হজের মূল খুতবা বাংলাসহ প্রায় ৩৫টি ভাষায় সরাসরি অনুবাদ ও সমপ্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই খুতবা বিশ্বব্যাপী লাইভ প্রচার করা হবে।
এরপর হাজিরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই আরাফাতের ময়দান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করবেন। মুজদালিফায় অবস্থানের সময় তারা শয়তানকে মারার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন। ১০ জিলহজ বুধবার ফজরের নামাজ পড়ে আবার রওনা দেবেন মিনার উদ্দেশে। এরপর কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে স্বাভাবিক পোশাকে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন হাজিরা। তাওয়াফ, সাঈ (সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত দৌড়ানো) শেষে মিনায় ফিরে গিয়ে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান করবেন ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। (কিছু হজযাত্রী ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করেন)। প্রত্যেক শয়তানকে সাতটি করে পাথর মারতে হয়। মসজিদে খায়েফ থেকে মক্কার দিকে আসার সময় প্রথমে জামারায় সগির বা ছোট শয়তান, তারপর জামারায় ওস্তা বা মেজ শয়তান, এরপর জামারায় আকাবা বা বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
বলা হয়, হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ সন্তান ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার জন্য মিনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামারায় পৌঁছালে শয়তান তাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন শয়তানকে লক্ষ্য করে তিনি পাথর নিক্ষেপ করেন। তিন শয়তানকে তাকবিরসহ পাথর নিক্ষেপ করা হজের অপরিহার্য অংশ। শয়তানের প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই পাথর নিক্ষেপ করা হয়। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ হাজীদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। জামারা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য জামারার ভেতরে একাধিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান ও সেলুন। জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাডও। পাথর নিক্ষেপের সুবিধার্থে মিনার পূর্ব দিক থেকে আসা হাজীরা আসবেন নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজীরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজীরা পঞ্চম তলায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করবেন। ১২টি করে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ আছে এখানে। এখন হাজীদের পাথর মারার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া আছে। মোয়াল্লেম নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পাথর মারতে হয়।
তাঁবুর শহর মিনা :
মিনার যেদিকে চোখ যায়, তাঁবু আর তাঁবু। মিনা যেন তাঁবুর শহর। হজের অংশ হিসেবে সোমবার হজযাত্রীরা মিনায় পৌঁছান। চৌচালা ঘরের মত এসব তাঁবুতে থাকেন। এ সময় মিনায় আগুন জ্বালানো নিষেধ। কারণ তাঁবুতে আগুন লেগে যেতে পারে। ফলে এত লোকের খাবারও বাইরে থেকে রান্না করে নিয়ে আসতে হয়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এসব তাঁবুতে আছে বাতি, বাথরুম। কিছু দূর পর পর আছে খাবারের দোকান। এই দোকানগুলো বছরে পাঁচ দিনের জন্য খোলা থাকে।
মোয়াল্লেমের কাছ থেকে দরপত্রের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা দোকান নেন। তাঁবুগুলো দেখতে একই রকম হওয়ায় অনেক হজযাত্রীর পক্ষে পথঘাট ঠিক রেখে নিজের তাঁবুতে যাতায়াত করা কঠিন হয়। সেজন্য সহায়তাকারী হিসেবে আছে স্কাউট ও হজ গাইড। বাংলাদেশ হজ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে হজযাত্রীদের আরাফাত ও মিনার তাঁবু নম্বর–সংবলিত মানচিত্র বিতরণ করা হয়েছে। মিনায় কোনো গাড়ি চলে না, শুধু চলে পুলিশের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স। হজের এই পাঁচ দিন ছাড়া মিনার পুরো এলাকা খালি পড়ে থাকে। চারপাশের প্রবেশদ্বারও তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির লাইন, টেলিফোন সংযোগ। হজের দুই দিন আগে মিনা এলাকার ফটক খোলা হয়। হজের দুই দিন পর আবার সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মিনায় অবস্থান করা হজের অংশ। মিনার কাছেই সৌদি বাদশাহর বাড়ি, রাজকীয় অতিথি ভবন। হজযাত্রীরা মোয়াচ্ছাসা (হজের সার্বিক বিষয় দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ) কার্যালয়, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। মিনায় আরও একটি মসজিদ আছে, নাম কুয়েতি মসজিদ। সামান্য ঘোরাফেরার বাইরে হজযাত্রীরা সারা দিন নিজ নিজ তাঁবুতে নামাজ আদায়সহ ইবাদত–বন্দেগি করেন। চলতি বছর নুসুক কার্ড ছাড়া কেউ হজ করতে পারবেন না। হজের অনুমতি নেই, এমন কোনো ব্যক্তিকে পরিবহন করা হলে পরিবহনকারীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানা করা হবে। মিনা ও আরাফায় হাজীদের তাঁবুতে নুসুক কার্ড ছাড়া কাউকে পাওয়া গেলে অর্থদণ্ড আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিজিটাল এই নুসুক কার্ডে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীর প্রয়োজনীয় সব তথ্য থাকে। হজের জন্য মিনা, আরাফা, মুজদালিফা, মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে চাইলে এই কার্ড অবশ্যই দেখাতে হবে। এ বছর বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখের বেশি মুসলমান হজ পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে এবার হজ পালন করতে গেছেন ৭৯ হাজার ১৬৪ জন।












