নোম্যানসল্যান্ড হলো সীমান্তবর্তী দুটি দেশের মধ্যে অবস্থিত একটি বাফার অঞ্চল বা ফাঁকা জমি যাকে বাংলায় শূন্যরেখা বলা হয়। এই জমির মালিক কোন দেশেরই নয় এবং এই অঞ্চল দুইটি কোন দেশের অধীনে থাকবে না। মধ্যযুগের যে জমি কারো নিয়ন্ত্রণে নেই বুঝাতে নোম্যানসল্যান্ড কথাটি ব্যবহৃত হলেও এই পরিভাষাটির বহু প্রচলন শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুদ্ধের সুবিধার্থে দুই দেশের মাঝখানে বাফার জোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। তখন প্রতিপক্ষ দুইটি সেনা দলের মূল পরিখার মাঝখানে কাঁটাতার ও মাইন বেষ্টিত ফাঁকা স্থানটিকে নোম্যানসল্যান্ড বলা হত। পরিখার ভিতরে দুই পাশে মাত্র কয়েক ফুট পর্যন্তই দেখা যায়। সামনের ও পিছনের পরিখার দেয়ালে গিয়ে শেষ হয় এবং উপরে ধূসর আকাশ দেখা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিখাগুলো বালির বস্তা, কাঠের তক্তা, বোনা কাঠি, জট পাকানো কাঁটাতার বা এমন কি শুধু দুর্গন্ধযুক্ত মাটি দিয়ে তৈরি করা হতো। পরিখাগুলো যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছিল। ভাঙা গোলা, বারুদের বাক্স, খালি কার্তুজ, ছেঁড়া ইউনিফরম, চূর্ণ–বিচূর্ণ হেলমেট, ময়লা ব্যান্ডেজ, হাড়ের টুকরো ইত্যাদি জিনিসে পরিপূর্ণ ছিল। পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য নো ম্যান্স ল্যান্ড কয়েকটির মধ্যে সুদান, মিশর, ইসরায়েল ও জর্ডান, ফ্রান্স ও জার্মানি, তুরস্ক ও গ্রিস ইত্যাদি দেশের সীমান্তের মাঝে অবস্থিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সীমান্ত প্রাচীর আছে। নানান কারণে এসব প্রাচীর দেওয়া হয়। এন্টার্কটিকা একটি অনন্য মহাদেশ কারণ এখানে কোন আদি মানব বসতি নেই। এন্টার্টিকাকে নোম্যানসল্যান্ড বলা হয়। এন্টার্টিকায় কোন দেশ নেই। ১৯৫৯ সালের এন্টার্কটিকা চুক্তির আগে সাতটি দেশ এন্টার্কটিকার ভূখণ্ডের উপর নির্দিষ্ট দাবি করেছিল। এই চুক্তিটি কোন দাবিকে আইনগত স্বীকৃতি দেয় না। মেরি বার্ড ল্যান্ড (লাল) হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম দাবিবিহীন ভূখণ্ড। মেরি বার্ড ল্যান্ড হলো পশ্চিম এন্টার্কটিকার একটি বিশাল অঞ্চল যা কোনো রাষ্ট্রই কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দাবী করেনি। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম দাবি বিহীন ভূখণ্ড। আধুনিক যুগেও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সীমান্তে অমীমাংসিত ভূমি রয়েছে যেখানে ভূখণ্ডের উপর বিভিন্ন দেশের দাবি ও পাল্টা দাবি চলে আসছে। উদাহরণস্বরূপ পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরি অঞ্চলে, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্তে এবং ইসরাইল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে কিছু অংশে অমীমাংসিত ভূমির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এইসব অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমানা (জিরো লাইন) থেকে ওই দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫০ গজ পর্যন্ত ফাঁকা এলাকাগুলোকে নোম্যানসল্যান্ড অথবা শূন্যরেখা বলা হয়। উভয় দেশের মাঝখানে মোট ৩০০ গজ এর আওতায় পড়ে। ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী এই এলাকায় কোন স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা এবং স্থায়ী আবাস গড়ে তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোন ধরনের চাষাবাদ করা নিষিদ্ধ। ১৯৭৫ সালের সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়। নোম্যানসল্যান্ড এর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দুই দেশের দিকে সীমান্ত হাট বসে। এর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বৈধভাবে পণ্য বেচাকেনা করতে পারে। কুড়িগ্রাম সুনামগঞ্জ ও ফেনী সীমান্তে চালু হয়েছে। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বিজিবি এবং ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বি এস এফ নজরদারি চালায়। দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কোন ভুল বোঝাবুঝি হলে, অনুপ্রবেশ করলে ও ব্যাক করার চেষ্টা করা হলে শুন্যরেখায় জাতীয় পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরবর্তীতে তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রায়শই দেখা যায় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি ও বিএসএফ) মধ্যে কোনো না কোনো জটিলতা বা অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে। অনুপ্রবেশকারীদের সাময়িকভাবে এই শূন্যরেখায় বা নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করতে হয়। তবে জাতীয়তা নিশ্চিত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। কখনো কখনো শূন্যরেখায় বসবাসরত নাগরিকদের পরিচয় ও মানবাধিকার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ঝড় বৃষ্টি বাদল তুফানসহ যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও তাদেরকে শুন্যরেখায় অবস্থান করতে হয়। এই সময় সুযোগ পেলে অনেকেই পালিয়ে যায়।
বিভিন্ন সময় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইন করার চেষ্টার সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা পেয়ে থাকি। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন মানুষকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধী ও মানব পাচারের ক্ষেত্রে শূন্যরেখার ব্যবহার করা হয়। অবৈধ জিনিসপত্র আদান–প্রদানের ক্ষেত্রেও শূন্য রেখার অপব্যবহার করা হয়। সীমান্ত এলাকায় জোরদার করা হলে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় তাদের অনুপ্রবেশ ঠকানো হয়। সীমান্ত বিরোধ, অস্থিরতা, ভুল বোঝাবুঝি রোধে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে আনুষ্ঠানিক সভা বা পতাকা বৈঠক হয়। এটা সীমান্তের নিয়মিত ঘটনা। সীমান্ত অতিক্রমের সময় ও প্রয়োজনীয় ভিসা জটিলতায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ এই এলাকায় আটকা পড়েন। কাউকে কাউকে সীমান্ত অঞ্চল থেকে ধরে নিয়ে যায়। এই ধরনের সমস্যার সমাধানে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী যৌথভাবে পতাকা বৈঠকে আহবান জানান ও সমাধান করেন। ফেলানীর মৃত্যুর ঘটনা কোন নতুন ঘটনা নয়। কিছু কিছু মৃত্যু সংবাদ হয়। আবার অধিকাংশ ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
বর্তমান বিশ্বে আধুনিকতার ফলে বিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই অস্ত্রগুলো দিয়ে এক নিমিষেই যেকোনো স্থানে আক্রমণ করা সম্ভব হয়। মুহূর্তই সব ছারখার হয়ে যায়। গত পঞ্চাশ (৫০) বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ফলে বিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্রের মাধ্যমে জলপথ, স্থলপথ ও আকাশ পথে মুহূর্তেই আক্রমণ করা যায়। সবকিছুই পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। শুধু একটি নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক – ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। যুদ্ধেরও কিছু কিছু নিয়ম নীতি থাকে। যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী স্কুল কলেজ হাসপাতালগুলোকে নিরাপদে রাখার বিধান আছে। প্রাচীনকাল থেকে শূন্যরেখা ও নোম্যান্সল্যান্ডগুলো নিরাপদে রাখার বিধান আছে। সীমিত আকারের যুদ্ধে শুধু সৈন্য ও যুদ্ধের সাথে সরাসরি জড়িতরা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বর্তমানে যুদ্ধের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বর্তমান বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের সন্নিকটে উপস্থিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমার ব্যবহার দেখেছে। প্রযুক্তির উপকার এবং অপকারের মধ্যে মারণাস্ত্র তৈরি করা কারো কাম্য নয়। ক্ষুধা ও দারিদ্রপীড়িত দেশগুলোতে মারণাস্ত্র তৈরির টাকার সামান্যতম অংশ ব্যয় করলে একটি মানবিক বিশ্ব তৈরী করা সম্ভব।
উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য নিজ দেশ ত্যাগ করে। যারা বৈধ উপায়ে যায় তারা একসময় নিশ্চিত গন্তব্যে যেতে সক্ষম হয়। যারা অবৈধ উপায়ে দেশ ত্যাগ করে তাদেরকে স্থলপথ ও জলপথে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এই যাত্রাপথে মাঝে মাঝে মানবিক বিপর্যয় ঘটে। এদের অনেকেই একসময় শূন্যরেখায় আশ্রয়ের আশায় অপেক্ষায় থাকে। মাঝে মাঝে আবার অনেক দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে অনেকেই নো মেন্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পরবর্তী দেশ বার্মাতে বেশ কয়েক বছর ধরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করেছে। বার্মার সামরিক জান্তার অমানুষিক অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেকেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রতিক দাঙ্গার ফলে ছোটা গোলা বারুদ প্রায়ই বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পড়ে। মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে সব সময় উত্তেজনা বিরাজ করে। ভারতের সীমান্ত ঘিরে আরো অনেক দেশ আছে। স্থল সীমান্তে অবস্থিত দেশ হচ্ছে–বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, ভূটান ও আফগানিস্তান। আর সমুদ্র সীমান্তবর্তী দুইটি দেশ হচ্ছে– শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। এখানে উল্লেখ, সীমান্ত পরবর্তী বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন দেশে ভারত পুশ ইন এর চেষ্টা করে না। নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিবেচনায় শূন্যরেখা ও নোম্যানসল্যান্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় এই নিরাপদ অঞ্চলটি এখন অনিরাপদ। পারমানবিক বিশ্বে জলপথ, স্থলপথ ও আকাশ পথ যেন শুন্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ফোরণ হলেই সব শূন্যেই মিলিয়ে যাবে। তবুও আশা থাকবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হোক। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক বিশ্ব গড়ে উঠুক।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও শিক্ষক, ডা. ফজলুল–হাজেরা ডিগ্রী কলেজ।












