জনগণের বিশ্বাস অর্জিত হয় সততা আর জবাবদিহিতার মাধ্যমে

ডা. মোহাম্মদ রেজাউল করিম | বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে দেশটি আজ অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোসহ বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি একটি কঠিন বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই এ দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনও সীমিত আয় নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে জমি বিক্রি করে, ঋণগ্রস্ত হয় কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয়। সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ সারি, ওষুধের সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য আজও এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের অর্থ কোনো সরকারের নয়, কোনো রাষ্ট্রপতি, উপদেষ্টা, মন্ত্রী কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। এই অর্থ এসেছে কৃষকের ঘাম, শ্রমিকের পরিশ্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ভ্যাট, চাকরিজীবীর কর এবং সাধারণ মানুষের অসংখ্য ত্যাগের বিনিময়ে। ফলে এই অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয় জড়িত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি প্রবণতা বহুদিন ধরে প্রচলিত আছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনীতিকেরা সংযম, সাদামাটা জীবনযাপন এবং জনগণের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর অনেকের আচরণে যেন এক অদৃশ্য পরিবর্তন ঘটে। সরকারি গাড়ি, সরকারি বাসভবন, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, নানা ধরনের সুযোগসুবিধা এসব যেন ধীরে ধীরে অধিকার বলে মনে হতে থাকে। তখন রাষ্ট্র আর জনগণের নয়; রাষ্ট্র যেন ক্ষমতাবানদের বিশেষ সুবিধা ভোগের একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

সমপ্রতি বিভিন্ন মহলে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ, কোথাও আবার এমন রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমনের আলোচনা, যার চিকিৎসা বাংলাদেশের স্বনামধন্য হাসপাতালেই সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন। এসব অভিযোগ সত্য বা অসত্য তা নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য যখন জনগণের মনে প্রশ্ন জন্ম নেয়, তখন সেই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে একজন মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী সরকারি অর্থে সামান্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করলেও তাঁকে সংসদ, গণমাধ্যম এবং জনগণের কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই কেবল নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ পর্যন্ত করেছেন। কারণ তাঁরা জানেন, গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস।

আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। বরং অনেক সময় দেখা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদগুলোকে সেবার পরিবর্তে সুবিধা ভোগের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। সরকারি পদে বসেই অতিরিক্ত সুযোগসুবিধার দাবি, বিলাসবহুল বিদেশ সফর, অযৌক্তিক ব্যয় এসব জনগণের মনে হতাশা সৃষ্টি করে। এতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং সর্বোপরি দুর্বল হয় জনগণের আস্থা।

একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ এমন সরকার সাধারণত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে রাষ্ট্রকে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করে। তাই তাদের প্রতিটি আচরণ হতে হবে মিতব্যয়িতা, স্বচ্ছতা এবং আত্মসংযমের উদাহরণ। যদি সেই সরকারও অতীতের বিতর্কিত সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে জনগণের আশা ভঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতার বিকল্প নেই। আইন কখনও কখনও কোনো ব্যয়কে বৈধ বলতে পারে, কিন্তু সব বৈধ ব্যয় নৈতিক হয় না। জনগণের করের অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন সব সময় সামনে রাখতে হবে এই অর্থ কি সত্যিই জনস্বার্থে ব্যয় হচ্ছে, নাকি ব্যয় হচ্ছে ক্ষমতার সুবিধাভোগীদের জন্য?

এখন সময় এসেছে একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের। রাষ্ট্রের অর্থে বিদেশে চিকিৎসা তখনই হওয়া উচিত, যখন দেশের স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন মেডিকেল বোর্ড লিখিতভাবে ঘোষণা করবে যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত সরকারি ব্যয়ের তথ্য যথাসম্ভব জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বচ্ছতা যত বাড়বে, জনগণের আস্থাও তত বাড়বে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কেবল ভবন, গাড়ি কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর নাম নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার জনগণের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস অর্জিত হয় সততা, সংযম এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ; সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিপন্ন মানুষ বিপর্যস্ত জনজীবন
পরবর্তী নিবন্ধবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্য-শিক্ষা কার্যক্রম