নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়

এমিলি মজুমদার | বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝিনিহ্যাঁ, আমি আমার কথাই বলছি। তবে এটাও সত্যি, আমার মতো এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নারী আমাদের সমাজে কম নন; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠই বলা যায়। বিশেষ করে বিবাহিত জীবনে আমরা সংসারের প্রতিটি মানুষের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে স্থান দিই। এর চাইতেও বড় কথা হলো, আমরা সংসারের সবার প্রয়োজন মেটানোকে এমনভাবে নিজের দায়িত্ব মনে করি যে, একসময় নিজের প্রয়োজনের কথাই ভুলে যাই।

স্বামী, সন্তান, শ্বশুরশাশুড়ি, আত্মীয়স্বজনসবার জন্য দিনরাত এক করে দিতে পারি। অথচ পুরো চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিজের জন্য এক ঘণ্টা সময় বের করার কথা যেন কখনো মনেই আসে না। এক ঘণ্টা! মানে ৬০ মিনিট! ওরে বাবা।

ভোর পাঁচটা বা ছয়টা থেকেই শুরু হয় আমাদের দিনের যুদ্ধ। ঈশ্বরের নাম নিয়ে ঘুম থেকে উঠেই সকালের জলখাবার, স্কুলগামী সন্তানের টিফিন, কারও অফিসের খাবারের ব্যবস্থা। সকালের কাজ শেষ হতে না হতেই দুপুরের রান্না, তারপর বিকেলের টিফিন, আবার রাতের খাবারের প্রস্তুতি। বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের পছন্দঅপছন্দ মাথায় রেখে প্রতিদিনের খাবারের তালিকা তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। রান্না করতে করতেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবার টেবিলের অভিব্যক্তিকে কোন পদ পেলে খুশি হবে, কোন খাবারে কার মুখের হাসি ম্লান হয় সেটাও ভাবতে হয়।

এর বাইরেও ঘর গোছানো, বাজার করা, বিল পরিশোধ, কর্মজীবী মহিলার ক্ষেত্রে অফিসের দায়িত্ব, সন্তানের পড়াশোনা, অসুস্থের সেবা, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবরএকটার পর একটা দায়িত্ব পালন করতে করতে কখন যে রাত বারোটা বাজে, তা টেরই পাই না। যেন আমরা মানুষ নই, নিরলস ছুটে চলা একেকটি মেশিন।

কিন্তু আমরা ভুলে যাই, মেশিনও তো সার্ভিসিং ছাড়া বছরের পর বছর সচল থাকে না। সময়মতো যত্ন, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ আর মেরামত না করলে সেটিও একসময় বিকল হয়ে যায়। অথচ নিজের শরীরের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক উল্টোটা করি। বছরের পর বছর শরীরকে ব্যবহার করে যাই, কিন্তু তার যত্ন নেওয়ার কথা মনে রাখি না।

নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্য পরীক্ষাসবকিছুই যেন ‘পরে করব’ তালিকায় পড়ে থাকে। অন্যের প্রয়োজনের বেলায় আমাদের উত্তর থাকে, ‘এখনই’; আর নিজের বেলায়, ‘পরে’। কিন্তু সেই ‘পরে’ আর কোনোদিন আসে না।

যখন শরীরে শক্তি থাকে, তখন মনে হয়, ‘আমার কিছু হবে না, আমি সব সামলে নিতে পারব।’ আর দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বেলায় মনে হয়, ‘ওরা পারবে না, সময় বেশি লাগবে, নয়তো নষ্ট করে ফেলবে!’ পরিবারের সবাইকে পছন্দের খাবার পরিবেশন করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, অজান্তেই সেটাই হয়ে যায় আমাদের প্রিয় খাবার। ভুলে যাই, একসময় মাছের মাথা, মুরগির রান, ইলিশের বড় পেটি কিংবা ডিমও আমাদের নিজের পছন্দের তালিকায় ছিল। বাড়ির কারও ওষুধ খাওয়ানোর সময় কখনো ভুল হয় না, অথচ নিজের ওষুধ খাওয়ার সময় হলেই বেমালুম ভুলে যাই। নিজের জন্য কিছু কিনতে গেলে বারবার হিসাব কষি, কিন্তু পরিবারের অন্যদের জন্য সবচেয়ে ভালোটা কিনতে এক মুহূর্তও ভাবি না।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, একসময় পরিবারের অন্য সদস্যেরাও এই সেবাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। যেন এটাই আমাদের দায়িত্ব, এটাই আমাদের কাজ। খুব কম মানুষই ভাবে, এই মানুষটারও বিশ্রাম দরকার, এই মানুষটাও অসুস্থ হতে পারে। তবে এর জন্য শুধু তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাই এমন একটি অভ্যাস তৈরি করি, যেখানে কাউকে কোনো কাজ করতে দিই না। মনে করি, ‘ওরা পারবে না, আমি করে দিই।’ ধীরে ধীরে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর আমরাও নিজের ক্লান্তিকে অস্বীকার করতে শিখে যাই।

কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন একে একে জানিয়ে দেয়-‘আর পারছি না, এবার একটু আমার কথাও ভাবো।’ অথচ তখনও আমরা নিজের জন্য সময় বের করতে পারি না। আমার কথাই ধরি। একসময় সকাল ছয়টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করেছি, বিরামহীন ছুটেছি। আর আজ? মাত্র পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই বসার জায়গা খুঁজি। দশপনেরো মিনিট হাঁটতেই মনে হয়, একটু বসি। ষাটের ঘর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন একে একে সব হিসাব চুকিয়ে দিতে শুরু করেছে। হাত কাঁপছে, চোখে ঝাপসা দেখছি, হাঁটুতে ব্যথা, হাঁটাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

তখন মনে হয়, সময় থাকতে যদি নিজের জন্য একটু সময় বের করতাম! নিয়মিত হাঁটতাম, শরীরচর্চা করতাম, ক্যালসিয়াম ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন নিতাম, খাবারের প্রতি আরও সচেতন হতামতাহলে হয়তো আজকের অবস্থাটা কিছুটা হলেও ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন আর অনেক কিছুই ফিরিয়ে আনা যায় না। হাঁটুর কার্টিলেজ একবার ক্ষয় হয়ে হাড়ে হাড়ে যখন ঘষা খায়, তখন শুধু আফসোস করেই দিন কাটাতে হয়। তখন বুঝি, নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা কোনো ত্যাগ নয়; বরং নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায়।

আজ আমি নিয়ম করে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে পায়ের ব্যায়াম করি। কারণ তা না করলে ঠিকমতো হাঁটতেই পারি না। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাত আটটার আগেই রাতের খাবার খেয়ে ফেলি। যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করি। আগে যেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিইনি, এখন সেগুলোই জীবনের সবচেয়ে জরুরি অভ্যাস হয়ে উঠেছে। তবু মনে হয়, যদি এই অভ্যাসগুলো আরও বিশত্রিশ বছর আগে গড়ে তুলতে পারতাম!

তাই আমার ছোট ভাইবোন, অনুজ, বন্ধু এবং পরবর্তী প্রজন্মের সব নারীর কাছে একটি আন্তরিক অনুরোধপ্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় শুধু নিজের জন্য রাখুন। নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত জল পান করুন, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, প্রয়োজনে ওষুধ খেতে ভুলবেন না। নিজের শখের জন্যও কিছুটা সময় রাখুন। কারণ সুস্থ শরীর ও সুস্থ মনএই দুটির কোনো বিকল্প নেই।

মনে রাখবেন, নিজের যত্ন নেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়; এটি একটি দায়িত্ব। কারণ আপনি ভেঙে পড়লে, আপনার ওপর নির্ভর করা মানুষগুলোর জীবনও অনেকটাই থমকে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধত্রিশূলে বিঁধে আছে আব্রুর শাসন
পরবর্তী নিবন্ধবিপন্ন মানুষ বিপর্যস্ত জনজীবন