প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, নিজের ইচ্ছায় অনিচ্ছায় দিবারাত্রি কৃত গুনাহ ও পাপের কথা স্মরণ করে তাঁর নিকট তাওবা এস্তেগফার করুন, ক্ষমা প্রার্থনা করুন, বন্যা প্লাবন, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছাস, প্রাকৃতিক ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাঁকে স্মরণ করুন।
বন্যার্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবতার পরিচয়:
ইসলাম মানবতার ধর্ম, অসহায় বিপদগ্রস্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহাযার্থে পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইসলামের কল্যাণকর নির্দেশনা অনুসরণ ও মেনে চলাকে ইসলাম অপরিহার্য করেছে। দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় মানুষের সেবা করা ইসলামে পুণ্যময় কাজ ও ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “তোমরা সৎকাজ ও তাকাওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করি। (সূরা: আল মায়িদাহ, ৫:২)
বন্যার্ত মানুষের জীবন রক্ষায় যারা এগিয়ে আসবে তাঁদের এ মহৎ কাজকে ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।( সূরা: আল মায়িদা, ৫:৩২)
বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা:
অসহায় বন্যা কবলিত বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী জরুরি উপকরণ সরবরাহ করা উত্তম সেবামূলক কাজ হিসেবে ইসলাম বিবেচনা করেছে। এ পুণ্যময় কাজে রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহতে বিশ্বাসী বান্দাদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মিসকীন, এতিম ও বন্দীকে আহার দান করে। (সূরা: আল ইনসান: ৭৬:৮)
সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি:
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিশটির অধিক জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি, অতিবৃষ্টি অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্য রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভী বাজার, হবিগঞ্জ, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ২০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ভারী বর্ষণ পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ৫০ জনেরও অধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ১০ লক্ষের অধিক মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় তিন লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যাতায়াত, সড়ক, সেতু কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি বিপন্ন হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে কৃষি জমি গবাদি পশু ভেসে গেছে, মানুষের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার সীমা নেই।
বিপদাপদ ও দুর্যোগ মহান আল্লাহর পরীক্ষা:
মানুষকে আল্লাহ তা’আলা আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করতে মহান আল্লাহ বান্দাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন–সম্পদ, জীবন ও ফল–ফসলের ক্ষয় ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব, আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। (সূরা: আল–বাকারাহ, ২:১৫৫)
হাদীসের আলোকে বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে আসার নির্দেশ:
বন্যার্ত মানুষদের উদ্ধারের ব্যবস্থা , খাদ্যের ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সামগ্রী, শুকনো খাবার ইত্যাদি সহযোগিতা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অনুপম আদর্শ ও নবীজির শিক্ষা। ইসলাম সর্বাবস্থায় ত্যাগ ও সেবাকে গুরুত্ব দিয়েছে। মানব সেবা উত্তম ধর্ম। মানবতার কল্যাণে কাজ করা, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানো মানবিকতা সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মমত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা মু’মিনের অনুপম বৈশিষ্ট্য।
হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দুনিয়ার বিপদ সমূহের মধ্যে থেকে কোন একটি বিপদ দূর করে দিবে মহান আল্লাহ তার কিয়ামতের দিনের বিপদাপদের মধ্যে থেকে বিপদ দূর করে দিবেন, আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার অভাবগ্রস্ত লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতে অভাব দূর করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭০২৮)
অসহায় প্রতিবেশীকে খাদ্য দান করা ঈমানের পরিচায়ক:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুমন নয়, যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (আল আদাবুল মুফরাদ: ১১২)
বিশ্ব মানবতার নবী, রহমতের কান্ডারী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন, যে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।
বন্যা কবলিত মানুষকে দান করা ইবাদত:
বদান্যতা ও দানশীলতা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য। কৃপণতা ভোগবাদী মানসিকতা মুনাফিকী চরিত্র। মু’মিনগণ কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। পরকালীন কল্যাণ ও শান্তি অর্জনে সচেষ্ট থাকে, ফিরিস্তাগণ তাদের জন্য দুআ করেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, প্রতিদিন প্রভাতে বান্দা যখন দান করেন তখন দুই জন ফিরিশতা অবতরণ করেন একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানশীলকে তার প্রতিদান দাও, আর অপর জন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণ লোককে শীঘ্রই ধ্বংস করো। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৩৫১)
উপর্যুক্ত হাদীসের শিক্ষা হলো অসহায়দেরকে কল্যাণে সাহায্যকারী বান্দা সৌভাগ্যবান, পরকালে তাঁর নেক আমলের উত্তম প্রতিদান ভোগ করবেন। যারা সচ্ছলতা ও সামর্থ থাকা সত্বেও অভাবী লোকদের বিপদে সাড়া দেয়না, দান সাদকা করেনা, মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসেনা তারা অমানুষ, তারা অভিশপ্ত। ইহকালেও তারা নিন্দিত, পরকালেও তারা মহান আল্লাহর দয়া ও রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের প্রতি রয়েছে ফিরিস্তাদের অভিশাপ।
মানুষের কল্যাণ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসবে:
পৃথিবীতে কেউ স্থায়ীভাবে সুখী নয়। সুখ–দুঃখ, সুস্থতা–অসুস্থতা, সক্ষমতা–অক্ষমতা, সচ্চলতা–অসচ্ছলতা, সফলতা–ব্যর্থতা, আনন্দ–বেদনা, উত্থান–পতন, জয়–পরাজয়, ভাল–মন্দ, মানব জীবনের বৈশিষ্ট্য। কারো বিপদে আনন্দিত না হয়ে মানুষ হিসেবে মানবিকতা প্রদর্শন করা, মানবিক আচরণ করা, মানবতার পরিচয় দেয়া মানবতার শিক্ষা ও আদর্শ ধারণ করা ও বাস্তব জীবনে এর চর্চা ও প্রতিফলন করা জীবনকে উন্নত ও মহিমান্বিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোন মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে আল্লাহ ততক্ষণ তার কল্যাণে রত থাকবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭০২৮)
দলমত নির্বিশেষে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান। ইতোমধ্যে সরকারি দল, বিরোধী দল, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সংস্থা, ধর্মীয় মানবিক সংগঠন গুলো আলেম উলামা ও জনপ্রতিনিধি গণ বন্যা কবলিত এলাকায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার পরিচয় দিয়েছে। এখন জরুরি হয়ে পড়েছে বন্যা পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিবার গুলোর পুনর্বাসন, বাড়িঘর সংস্কার মেরামত। মহান আল্লাহ আমাদের দেশের জনগণ ও সরকারকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত প্রসারিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
[ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
Email : azadieditorial@gmail.com
মুহাম্মদ ওবাইদুল করিম
বটতলী, অক্সিজেন বায়েজিদ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষে নির্মাণ সামগ্রী যদি অবশিষ্ট থেকে যায়, সেই অবশিষ্ট সামগ্রী কি মসজিদের বাইরে অন্য কোনো কাজে যেমন ভাড়ার জন্য নির্মিত দোকান, বাসস্থান, অজুখানা ইত্যাদি নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে কিনা? জানালে কৃতার্থ হব।
উত্তর: যদি কোনো ব্যক্তি বা দাতা শুধুমাত্র মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে নির্মাণ সামগ্রী বা অর্থ দান করেন তবে সেই সামগ্রী বা অর্থ কেবল মসজিদ নির্মাণেই ব্যয় করতে হবে। তা মসজিদের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট স্থাপনা যেমন ভাড়ার দোকান, আবাসিক ভবন, অজুখানা ইত্যাদি নির্মাণে ব্যয় করা বৈধ নয়। তবে যদি দাতা মসজিদের সাধারণ প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে দান করেন এবং দানের ক্ষেত্রে নিদ্দিষ্টভাবে শুধু মূল মসজিদ ভবনের কথা উল্লেখ না থাকে তাহলে সেই অর্থ বা সামগ্রী মসজিদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্থাপনা যেমন অজু খানা, দোকান, বাসস্থান বা অনুরুপ অবকাঠামো নির্মাণেও ব্যয় করা যেতে পারে। (তথ্য সূত্র: ফতোওয়া ফয়যুর রাসূল, পৃ: ৩৭২–৩৭৩, ফতোওয়া কাজীখান, খন্ড: ৩, ফতোওয়া হিন্দিয়ার সঙ্গে মুদ্রিত, পৃ: ৩০০)












