(গত সংখ্যার পর)
আমি বিষয়টা বুঝি। চল্লিশে পা রেখে আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন এসেছিল, হাড়ের মজ্জায় মিশে থাকা এক ধরনের অনীহা, যা প্রায় রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার মতোই প্রবল; প্রস্তুত না হয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার এক জেদ। কোনো বিষয়ে ক্ষমা চাওয়া বা অন্যদের সাথে মানিয়ে নেওয়ার কোনো বালাই নাই। ভাল না লাগলে, আমার পাশ কাটিয়ে চলে যাও, সহজ কথা।
বেশিরভাগ মানুষই জানে না যে, কচ্ছপের পিঠের উঁচু খোলসটিতে আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে আঁচড় কাটলে ওই কচ্ছপটির মধ্যে এমন এক প্রতিক্রিয়া হয় যাকে প্রাণীর পরিচর্যাকারীরা ‘ফিনচিং’ বলে। কচ্ছপটি তখন তার পায়ের ওপর ভর দিয়ে, ঠিক যেন কোনো হাইড্রোলিক যন্ত্রের মতো–সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ঘাড় প্রসারিত করে এবং তার গোটা শরীর সেই স্পর্শে সায় জানায়। যেন সে বলছে: হ্যাঁ হ্যাঁঁ, ধন্যবাদ, আরও একটু আঁচড়ে দাও। সে তাড়াহুড়ো করে ঝাঁপিয়ে পড়ে না বা দৌড় দেয় না; কেবল ধীরলয়ে সেই অনুভূতির প্রতি সাড়া দেয় যা পেয়ে তার ভালো লাগছে।
আমি কখনোই এমন ‘ফিনচিং’ বা স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেওয়ার অভিজ্ঞতা পাইনি। আমি কেবল জানতাম কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।
কিছু মানুষ যেমন করে ধার–দেনা জমিয়ে ফেলে, আমিও ঠিক সেভাবেই নতুন সম্পর্কের শুরুর মুহূর্তগুলো জমাতাম, খুব উত্তেজনা নিয়ে, তাড়াহুড়ো করে, আর সেই সময়টাতে ভাবতাম, যে, আপাতত এরকম চলুক, ভবিষ্যতের ‘আমি’ কোনো না কোনোভাবে এর একটা সুরাহা করে ফেলব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বলা, নতুন করে কারো সাথে মিতালী হওয়ার সেই যে অনুভূতি, এসব কাজে আমি বেশ পটু ছিলাম। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কেই, ‘মধ্যবর্তী পর্যায়’–এর লম্বা সময়টা আমাকে কাবু করে ফেলত: কাপড় ধোয়া, বাজারের ফর্দ তৈরি, ঝগড়া–বিবাদ, আর প্রতিশ্রুত যে জীবন, তার সাথে বাস্তবের যেমন জীবন–এই দুয়ের ব্যবধান।
বুঝতে বেশ সময় লেগেছিল যে, আমি আসলে সত্যিকারভাবে প্রেমে পড়ছিলাম না; বরং প্রেমে পড়ছিলাম সেই ‘প্রেমে পড়ার’ আবেগের। এমন কিছুর পেছনে ছুটছিলাম যা হাতের মুঠোয় এলেই মিলিয়ে যায়। প্রতিবারই নিজেকে বোঝাতাম, সমস্যা আসলে ওই মানুষটার। বিশ্বাস করতাম, জীবনে সঠিক মানুষটিকে পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, সেই ‘দ্রুত পতন’–এর দৃশ্যপট কেবল অনুভূতি হয়েই টিকে থাকবে। বস্তুত, আমি ছিলাম গল্পের সেই খরগোশের মতো, যে দৌড়াতে এতটাই ভালোবাসত যে ভুলেই যেত দৌড় শেষ করারও একটা গন্তব্য আছে। শুধুই চক্রাকারে ঘোরা, কেবলই গতি আর নিজেরই শ্বাস–প্রশ্বাসের উঠা–নামা শোনাই সব নয়।
প্রেম–ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় (বা যা নয়) তা আমি এতবার অতিক্রম করেছি যে, এর নকল চেহারা চিনতে আমি পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম: এমন একটি সম্পর্কের ভার যা শুধুমাত্র গতির জোরে টিকে আছে, আমরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখি কারণ চলে যাওয়া মানে স্বীকার করে নেওয়া, যে, অনেক আগেই চলে যাওয়া উচিত ছিল। আমি জানতাম ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে পড়ার অনুভূতি কেমন। প্রথমে হারিয়ে যেত আমার মতামত, তারপর প্রয়োজন, তারপর পছন্দ–অপছন্দ, এবং সবশেষে সেই সহজাত প্রবৃত্তি–যা ফিসফিস করে বলত, “কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে।” আমার যে ‘আমি’–কে একসময় চুপ করিয়ে দিয়েছিলাম, তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, যেখানে আমার থাকার কথা ছিল, সেখানে কেবল নারী আকৃতির এক শূন্য কাঠামো পড়ে আছে।
ফলে, খোঁজাখুঁজি বাদ দিলাম। কাউকে প্রলুব্ধ করা নয়, যৌনতা নয়, কিংবা ফোনের স্ক্রিনে অহেতুক হাতড়ানো বা সোয়াইপ করা, সব বন্ধ করে দিলাম। কাউকে সামলানোর বা মুগ্ধ করার কোনো দায় রইল না। নিজের সঙ্গ এড়িয়ে চলা বাদ দিলাম। আর কেউ যখন দেখছেই না, তখন স্বয়ং ‘আমি’ আসলে কেমন, সেটা খেয়াল করতে শুরু করলাম। প্রথম মাসটা কাটল নেশা ছাড়লে ঠিক যেমন যন্ত্রণা হয় সেরকম তীব্র অস্বস্তির মধ্য দিয়ে। তৃতীয় মাসে এল স্বস্তি। আর ষষ্ঠ মাসের দিকে এসে নিজের চিন্তাভাবনাগুলো স্পষ্ট বুঝতে পারলাম।
আর সেই নীরবতার এক নিস্তব্ধ কোণে, আমি আবার খুঁজে পেলাম স্বভাবসুলভ সেই নারীকে; অন্যের কথায় বা ইচ্ছায় নিজেকে বদলে ফেলার আগে আমি ঠিক যেমন ছিলাম। যে ছিল একাধারে বিদ্রোহী, রসবোধসম্পন্ন, সাহসী। সূর্যাস্ত দেখার জন্য সে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ত, অন্যের কান্না দেখে নিজেও কাঁদত। সে শিখেছিল কীভাবে বাগানে গাছপালা বাঁচিয়ে রাখতে হয়, আর ঠিক একইভাবে নিজের ভেতরের প্রাণশক্তিকেও। অন্যেরা তার সম্পর্কে কী ভাবল না ভবল, সেসব নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করাও সে ছেড়ে দিয়েছিল।
একটা সময় আমি কচ্ছপ সংরক্ষণ কেন্দ্রের খোঁজ পেলাম, ততদিনে আমার একাকী জীবন কাটানোর প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহে সেখানে যেতাম, শিখতাম কীভাবে সাবধানে পা ফেলতে হয়। ওদের জন্য আমার কোনো তাড়াহুড়া করার প্রয়োজন ছিল না। শীতঘুমের জন্য ওদের থাকার জায়গাগুলো প্রস্তুত করলাম; ছোট ছোট গুমটির মতন বানালাম, কচ্ছপরা জানে নিজেকে ঠিক কখন গুটিয়ে নিতে হয়।
সেরকমই এক বিকেলে, খড় আর পাতার গাদায় কনুই পর্যন্ত ডুবে থাকা অবস্থায়, আমি সেই কাঙ্ক্ষিত অনুভূতিটি খুঁজে পেলাম–পায়ের নিচে শক্ত মাটি, যা আমাকে শক্ত করে আমূল ধরে রেখেছে। কেউ আপনাকে এসে আগবাড়িয়ে বলবে না যে, নিজের আসল রূপে ফিরে আসা জিনিসটা বস্তুত কোনো জমকালো বিষয় নয়। এটা মূলত ভুল অভ্যাসগুলো ত্যাগ করা, বা মুছে ফেলা এবং সেইসব কথাগুলোকে ‘না’ বলা যা আগে আপনি ‘হ্যাঁ’ বলতেও দ্বিধা করেননি।
আর তারপর একদিন হঠাৎ করেই তা ধরা দেয়। আপনি এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠেন যিনি তাড়াহুড়া না করে সময় নিয়ে আস্তেধীরে চলেন এবং তার জন্য কাউকে কোনো কৈফিয়ত দেন না; এমন একজন যিনি এই বিশ্বাস নিয়ে নীরব হয়ে বসে থাকতে পারেন যে, সামনে যা–ই আসুক না কেন তিনি টিকে থাকবেন; এবং এমন একজন যিনি জানেন–পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজের আর বাইরের জগতের মাঝখানে অন্য কারও ঢাল হয়ে দাঁড়াবার প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞানীরা কচ্ছপের ডিম ফুটে বের হয়ে সমুদ্রে নামা এবং আবারও ঘরে ফেরার মধ্যবর্তী সময়টাকে ‘হারিয়ে যাওয়া বছর’ বা লস্ট ইয়ার বলে ডেকে থাকেন, কারণ ওই সময়টাতে সে কোথায় গিয়েছিল বা কী করেছিল, সে সম্পর্কে খুব কম তথ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু আমার মনে হয় না ওরা আদৌ হারিয়ে যায়। দশকের পর দশক ধরে অবারিত জলরাশি, হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ শক্তিশালী স্রোত, উত্তাল প্রবাহ আর পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ধীরলয়ের পরিবর্তন–এত কিছুর মধ্যেও তার দিকনির্ণয়ের মানচিত্রটি থাকে অটল! বাড়ি ফেরার পথ দেখানোর জন্য তার কারুর সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে না। কেবল পথের সেই টানটুকু অনুভব করার অপেক্ষায় তাকে থাকতে হয়।
জেসিকা সিয়েনসিন হেনরিকেজ। কলম্বিয়ান–আমেরিকান লেখক ও সম্পাদক। প্রেম, মাতৃত্ব এবং সম্পর্কের জটিলতা তথা অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অন্বেষণ তাঁর লেখালেখির উপজীব্য। তাঁর আসন্ন প্রবন্ধ সংকলন ‘ইফ ইউ লাভড মি, ইউ উড নো’ । বর্তমান লেখাটি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’–এ মডার্ন লাভ সিরিজে ‘নো মোর সেক্স’ ফ্লার্টিং, স্ক্রলিং অর সোয়াইপিং শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।













