লোহাগাড়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হেফজখানার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকির বাইরে পরিচালিত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে উপজেলার বিভিন্ন হেফজখানায় শিক্ষার্থী নির্যাতন, অস্বাভাবিক মৃত্যু, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। কিছু ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের নজরে এলেও অনেক অভিযোগ বিভিন্ন কারণে প্রকাশ্যে আসে না। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, অবকাঠামোগত মান, শিক্ষক নিয়োগ ও নিয়মিত তদারকি করার দাবি উঠেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গতকাল ৭ আগস্ট উপজেলা সদর ইউনিয়নের হোসেন মাতবর পাড়ার তালিমুল কুরআন মাদ্রাসা ও মাসুমা ফাউন্ডেশন এতিমখানায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী আসহাব হোসেন ফরহাদের (১০) মৃত্যু হয়েছে। গত ১৮ জুন আমিরাবাদ পুরাতন বিওসি এলাকায় নুরুল কোরআন মডেল মাদরাসা ও হেফজখানার এক শিক্ষার্থীকে শিক্ষক মারধর করায় হাতের আঙুল গুরুতর জখম হয়। এতে শিশুটির নখের কোনায় পচন ধরে। ১৩ এপ্রিল উপজেলা সদরের আলুরঘাট রোডস্থ টিএন্ডটি অফিসের পশ্চিম পাশে একটি ভবনের পঞ্চম তলায় পরিচালিত তা’লিমুল কুরআন ওয়াস্সুন্নাহ মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের শিক্ষক শিব্বির আহমেদ হাসানের (৩৪) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৫ সালের ১২ জুলাই আমিরাবাদ ইউনিয়নের কামারদীঘির পাড় এলাকার মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসা ও হিফজখানার ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক মুহাম্মদ বেলাল উদ্দিনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল সদর ইউনিয়নের দরবেশহাট রোডস্থ কাজীর পুকুর পাড় এলাকায় আল কুরআনুল কারীম ইনস্টিটিউটের শাহরিয়ার নাফিজ (১০) নামে এক শিক্ষার্থী ভবনের ৯ম তলার ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। একই বছরের ২৬ মে বড়হাতিয়া ইউনিয়নের তানজিনুল মুমিন হিফজ মাদরাসা ও হেফজখানায় শিক্ষকের প্রহারে আব্দুল্লাহ আল মুহিদ (১৩) নামে এক শিক্ষার্থীর একটি চোখ সম্পুর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৩ সালের ১০ মে পশ্চিম আমিরাবাদের ফাতিমাতুযযাহরা (রা.) মাদরাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী হোজাইফুল ইসলাম (৯) নামে এক শিশুকে মারধর করে গুরুতর আহত করেছিলেন শিক্ষক। ২০২২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সদর ইউনিয়নের মুনশি পাড়া এলাকার আল হেলাল মডেল হিফজখানায় এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২১ সালের ২৭ মে বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দুর্লভের পাড়া হেফজখানা ও এতিমখানায় এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক আব্দুল্লাহ মুজাহিদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট কলাউজান শাহ আমজাদিয়া হেফজখানায় ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে ডেকে তোলাকে কেন্দ্র করে করে দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে মাথায় লোহার রডের আঘাতে মিজানুর রহমান (১১) নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক তিন শতাধিক প্রাইভেট হেফজখানা পরিচালিত হচ্ছে। এরমধ্যে উপজেলা সদর এলাকার আশপাশেই রয়েছে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান। এসব হেফজখানার সিংহভাগই আবাসিক ভবনের ভাড়া বাসা ব্যবহার করে পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি একই ভবনে একাধিক প্রাইভেট হেফজখানার কার্যক্রম পরিচালনার চিত্রও দেখা গেছে। স্থাানীয়দের মতে, প্রাইভেট হেফজখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর সরকারি নীতিমালা ও নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সহজেই বাসা ভাড়া নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান চালু করার সুযোগ পাচ্ছেন। যার ফলে ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নূন্যতম অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তাই দ্রুত প্রাইভেট হেফজখানাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রাইভেট হেফজখানার সংখ্যা বাড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর কার্যকর নজরদারি নেই। অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সুবিধা, আবাসিক পরিবেশ ও শিক্ষকদের যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিমালার আওতায় এনে নিয়মিত পরিদর্শন, জবাবদিহি এবং ন্যুনতম নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একাধিক অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার আগ্রহ থেকেই প্রাইভেট হেফজখানায় ভর্তি করান। তবে ভর্তি দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের আবাসিক পরিবেশ, শিক্ষকদের যোগ্যতা, শিশুদের সাথে আচরণের ধরন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না। সন্তানকে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি হেফজখানাগুলোতে নিয়মিত তদারকি, অভিভাবকদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আত–তাজওয়ীদ ইনস্টিটিউটের (চুনতি) পরিচালক মুহাম্মদ মূসা তুরাইন জানান, হেফজ শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। তবে এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, মানসম্মত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকা অত্যন্ত জরুরি। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান চালু করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, মানসিক বিকাশের উপযোগী ব্যবস্থা ও আধুনিক এবং সঠিক শিক্ষাদান পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইভেট হেফজখানাগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় এনে নিয়মিত তদারকি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
আধুনগর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল খালেক জানান, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। তবে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। হেফজখানাগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ ও নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার পরিবেশ আরও নিরাপদ ও মানসম্মত হবে। এছাড়া প্রাইভেট হেফজখানাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ জানান, প্রাইভেট হেফজখানাগুলো পরিচালনা, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।












