প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা এলেই যেন পুরো দেশ এক ভিন্ন আবহে ঢুকে পড়ে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন–সবার মনোযোগ তখন একটি লক্ষ্যেই নিবদ্ধ থাকে, পরীক্ষা সুষ্ঠু হবে কি না। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ‘নকল’। কোনো কেন্দ্রে চিরকুট ধরা পড়েছে, কোথাও বই খুলে পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার গণহারে নকলের অভিযোগ উঠেছে–এসব খবরই ছিল সংবাদপত্রের প্রথম পাতার নিয়মিত বিষয়।
আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত। কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রশ্নফাঁস ও নকলবিরোধী কঠোর অবস্থানের ফলে পরীক্ষার হলে কাগজের চিরকুট নিয়ে নকল করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
কিন্তু সমাজের সামনে এখন একটি আরও গভীর প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে–আমরা কি শুধু নকলের ধরন বদলেছি, নাকি শিক্ষার সংকট আরও গভীরে পৌঁছে গেছে?
প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অসদুপায়ের ধরনও পাল্টেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নতুন ধরনের প্রতারণার সুযোগ তৈরি করেছে। এ কারণেই শিক্ষামন্ত্রীর সামপ্রতিক সতর্কবার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর থাকবে। ডিজিটাল প্রতারণা কিংবা প্রশ্নফাঁসের গুজব– কোনোটিই আর হালকাভাবে নেওয়া হবে না।
এই অবস্থান অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কারণ একটি দেশের পাবলিক পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা কমে যায়। তবে এখানেই যদি আমাদের আলোচনা শেষ হয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাবে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখন আর নকল নয়; বরং শেখার প্রতি আগ্রহের ক্রমাগত অবক্ষয়। আজ অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা মানে জ্ঞানার্জনের আনন্দ নয়; বরং পরীক্ষায় ভালো ফল করার কৌশল। পাঠ্যবইয়ের পুরো বিষয়টি বোঝার চেয়ে তারা খোঁজে সংক্ষিপ্ত নোট। অধ্যায়ের ধারণা আয়ত্ত করার বদলে মুখস্থ করে সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর। বিদ্যালয়ের পাঠকে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে নির্ভর করে কোচিং ও সাজেশনের ওপর। পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছুদিন পর সেই জ্ঞানও স্মৃতি থেকে মুছে যায়। এই প্রবণতা নকলের চেয়েও ভয়ংকর।
নকল একজন শিক্ষার্থীকে একটি পরীক্ষায় অন্যায় সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু কোচিং ও সাজেশননির্ভর শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকেই ধীরে ধীরে সংকুচিত করে দেয়। সে হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করে, কিন্তু নতুন কিছু বোঝার, প্রশ্ন করার, যুক্তি দাঁড় করানোর কিংবা স্বাধীনভাবে ভাবার সক্ষমতা গড়ে ওঠে না।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বহু বছর ধরেই এই সংকটের কথা বলে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে–বিশ্বজুড়ে শিক্ষা আজ একটি ‘লার্নিং ক্রাইসিস‘-এর মুখোমুখি। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে, পরীক্ষার ফলও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত শেখার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। শিক্ষার্থীরা সনদ পাচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই পর্যবেক্ষণ অচেনা নয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উচ্চমাধ্যমিকে অসাধারণ ফল নিয়ে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মৌলিক ধারণার দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিশ্লেষণধর্মী লেখা, গবেষণামুখী পাঠ, সমালোচনামূলক চিন্তা কিংবা যুক্তিনির্ভর আলোচনায় তারা প্রায়ই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এটি কোনো একটি প্রজন্মের ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকেত। এ কারণেই শিক্ষামন্ত্রীর সামপ্রতিক উদ্বেগকে শুধু নকলবিরোধী বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে আরও বড় একটি বার্তা লুকিয়ে আছে। সেটি হলো–পরীক্ষার সততা রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার মান রক্ষাও সমান জরুরি।
অভিভাবক সমাজের প্রতিক্রিয়াতেও এই উদ্বেগ স্পষ্ট। অধিকাংশ অভিভাবক চান সন্তান সৎভাবে পরীক্ষা দিক। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এটিও চান, সন্তান যেন শুধু নম্বরের জন্য না পড়ে; বরং সত্যিকার অর্থে শেখে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছেন, ভালো ফল সবসময় ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করে না। নাগরিক সমাজের আলোচনাও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কোচিং ও সাজেশননির্ভর শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। এমন শিক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যতের উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, গবেষক কিংবা দক্ষ নীতিনির্ধারক তৈরি করতে পারে না।
বিশ্ব এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে তথ্য মুখস্থ রাখার চেয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডেই হাজারো তথ্য এনে দিতে পারে। কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি প্রাসঙ্গিক, কোনটি যুক্তিসঙ্গত– সেই বিচার করার ক্ষমতা মানুষেরই থাকতে হবে। সেই ক্ষমতা তৈরি হয় চিন্তাশীল শিক্ষা থেকে; সাজেশন মুখস্থ করে নয়। তাই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শেখার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এমন শিক্ষা দরকার, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, ভুল করতে সংকোচ করবে না, কৌতূহলকে লুকাবে না এবং বইকে শুধু পরীক্ষার উপকরণ নয়, জ্ঞান আবিষ্কারের সঙ্গী হিসেবে দেখবে। নকল বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনা পুরো সমাজের দায়িত্ব। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার পরীক্ষার ফল নয়; নির্ধারণ করে তার মানুষের চিন্তার গভীরতা, জ্ঞানের ভিত্তি এবং নতুন কিছু সৃষ্টির সক্ষমতা। এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হয়তো এটি নয়–কতজন নকল করল। সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো–আমাদের শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই শিখছে? যেদিন এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিতে পারব, সেদিনই বলা যাবে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পরীক্ষায় নয়, প্রকৃত অর্থেই সফলতার পথে এগোচ্ছে।
লেখক: প্রফেসর, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।











