দূরের দুরবিনে

শিল্প-সংস্কৃতি : জাগতে হবে, জাগাতে হবে

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ at ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণতা দিয়েছিল সংস্কৃতি। পাকিস্তান আমলে সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানা ধ্বংসের যে পাঁয়তারা তার জবাব দিয়েছিল বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে সারা দেশে স্লোগান আর দেয়াল লিখন ছিল একটি বাংলা অক্ষর একজন বাঙালির প্রাণ। শব্দ, অক্ষর বা ভাষা যে জাতির প্রাণ হতে পারে তা আমাদের কী আগে জানা ছিল?

সংস্কৃতি তখন আমাদের কি কি দিয়েছে তার হিসেব করলে চমৎকৃত হবার বিকল্প থাকে না। সবচাইতে বড় কথা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রবীন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। বলা উচিৎ সংস্কৃতিই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল। নজরুলের মতো কবিকেও নতুন ভাবে পেয়েছিলাম বলেই তিনি আজ আমাদের জাতীয় কবি। শুধু কবি বা কবিতা নয় গান নাটক সিনেমা বা চিত্রকলা প্রায় সব বিষয়ে সংস্কৃতি আমাদের নতুন এক জীবন দান করে যার নাম বাঙালি জীবন। দুনিয়ার নানা দেশে ঘোরা ও পরিভ্রমণের সুযোগে আমি এটা জানি সংস্কৃতি বাংলাদেশের সবচাইতে বড় শক্তি। যার মূল বিষয় কথা বলা বা বলতে পারা। মানুষতো আসলে কথাই বলে সবকিছুতে। কবিতা গল্প বা প্রবন্ধে শুধু বলে? না। চিত্রকলার ভেতর দিয়েও সে তার না বলা কথাই বের করে আনে। যা করে নাটক যাত্রা বা অন্য কোন মাধ্যমেও। এই কথা বলার জায়গাটা ঠিক না থাকলে বা মুক্ত না হলে বিপদ। একটা গল্প মনে পড়ছে : আপনাদের হয়তো মনে থাকতে পারে রাশিয়ার সেই বিখ্যাত গল্পটি। ক্রুশ্চেভ তখন প্রধানমন্ত্রী পলিটব্যুরোর এক সভায় তিনি দুঃখ করে বলছিলেন, অনেক কথা আমরা স্তালিনের আমলে বলতে পারতাম না। এমন সময় নীরব সভাস্থলের মাঝখান থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, কেন, বলতে পারতেন না কেন? তখন তো আপনি পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন।

ভাষণ থামিয়ে ক্রুশ্চেভ জানতে চাইলেন, কে বললেন এই কথা? কেউ কিছু বলে না। থমথমে নীরবতা। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে জানালেন, আমি কথা দিচ্ছি আপনি দাঁড়ান আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। বরং আপনাকে দেখে অনেকেই সাহস পাবে। তবু কেউ দাঁড়াল না। কয়েকবার বলার পর তিনি হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ঠিক একই কারণে আমরাও তখন বলতে সাহস পেতাম না।

স্বাধীনতার জন্য দুটি বিষয় অনিবার্য। একটি ভোট আরেকটা কথা বলার অধিকার। কথা বলা মানে কিন্তু তোতার মতো শেখানো বুলি আওড়ানো নয়। গঠনমূলক আর সত্য বলার অধিকারের নামই মুক্তি। সে জায়গা থেকে আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের ৫৩ বছরে কোন সরকারই সত্য বলতে দিতো না। কেউ আংশিক, কেউ খণ্ডিত, কেউ তাদের মনের মতো করে বলার অধিকার দিলেও মূল কথা বলতে পারা ছিল কঠিন। যার কারণে একাধিক সরকারকে বিদায় নিতে বাধ্য করেছে জনগণ। তারপরও কারো কোনো শিক্ষা হয়নি। কেউ তা থেকে পাঠ নেয়নি। নিলে দেশ ছেড়ে ভেগে যাবার মতো বাস্তবতা দেখতে হতো না।

সবচাইতে বড় ক্ষতি হয়েছে সংস্কৃতির। কিভাবে তা সংঘটিত হয়েছে তা কমবেশি জানা আছে সবার। শুরুতে আমরা যেটাকে প্রশংসা ভাবতাম দেখা গেল সেটা রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। এক কথা এক বক্তব্য আর একধরনের স্তাবকতা। এই প্রক্রিয়ায় সবচাইতে বেশি জড়িত ছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতির মানুষজন। আমি সিনিয়র একজন প্রবীণ লেখককে প্রশ্ন করেছিলাম সর্বাধিক বিক্রিত নামে যে আত্মজীবনী তা এতকাল কোথায় গচ্ছিত ছিল? কেন তার আভাসটুকুও পেলো না কেউ? আমার এই নিতান্ত: সাধারণ জিজ্ঞাসার কুটিল উত্তর আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। এই যে ভয় লাগানো বা ভয় জাগানো এটা যেমন একদিকে আরেকদিকে ছিল স্তুতিবাদ। এই চক্রে পড়ে কত ভগবান যে ভূত হয়ে গেছিলেন আজ তার হিসেব করলে আমরা চমকে যাবো। যাঁদের আমরা দিকপাল জানি বা মানি তাঁদের কেউ ই আর কথা বলতেন না। যদি বলতেনও তা সবার জানা। নিন্দা সমালোচনা আর হক কথা বলা যে অধিকার সেটা প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছিল। যার চরম মূল্য চুকাচ্ছে সংস্কৃতি।

আজকাল কেউ আর গান বাজনা করে না। করলেও তা বলার সাহস রাখে না। অথচ বাংলাদেশ সুরের দেশ। এদেশের নদীর কল্লোলে সুর মেহনতি মানুষের কাজের সুর বিয়েতে সুর উৎসবে সুর এমন কি বেদনায়ও সুর আর গান। দেশে মহল্লা বা পাড়ায় গানের রেওয়াজ বিলুপ্ত প্রায়। ঘরে ঘরে হারমোনিয়াম তবলার দিন শেষ। বিগত দুই দশকে কেউ তার খবর রাখে নি। কেন তা বন্ধ হয়েছে কারা তা বন্ধ করেছে বা কিভাবে তার সমাধান করা যায় তা নিয়ে কথা বলে নি কেউ। সবচাইতে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে মিডিয়ায় এর প্রভাব।

বাংলাদেশে রেডিও জকি নামে পরিচিত জনদের সাথে কথা বললে আপনি ভয় পাবেন। সকালবেলার এক অনুষ্ঠানে আমাকে ইন্টারভিউ করার জন্য আসা এক বিখ্যাত জকির পোশাক দেখে আমি ভেবেছিলাম তিনি মূল্যবোধ বা নৈতিকতা বিষয়ক কোন অনুষ্ঠানের হোস্ট। শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক আয়োজনে তার মতো বিখ্যাতজন থাকা মানেই চাকা ঘুরছিল। এই চাকা যে পেছন দিকে যাচ্ছিল এটা যারা দেখেছেন বা বুঝতে পেরেছিলেন তারা মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। কারণ তাদের ততদিনে জানা হয়ে গেছিল উপার্জনের বাইরে আরাম আয়েশের বাইরে আর কিছু নাই। সে আরাম আয়েশ কতটা বা কতদিন টেকসই তা তাঁরা ভাবেন নি। সেটা তাঁদের অভিরুচি ও কর্মফল। কিন্তু আমরা দেখলাম ধর্মের ভীড়ে একটি শিল্পবান্ধব প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হলো না। নতুন করে শিল্পকলা বা তেমন কোন একাডেমি হলো না কোথাও।

রাজধানীর যে মহান বাংলা একাডেমি তার কাজ হয়ে গেল বছরে একবার পুরস্কার দেয়া। সে পদক কে পাবেন বা পেতে পারেন তার জন্য কি কি করতে হতো সে এখন এক ইতিহাস। লাভ কি হলো? লাভ এই, বাংলা একাডেমি পদক ভূষিতরা ছবি তুললেন সামাজিক মিডিয়া ফাটিয়ে দিলেন এটুকুই। নয়া কবিতা গান নাটক বা নিবন্ধের ঘরে অশ্বডিম্ব। তাহলে সাহিত্য কিভাবে এগুবে?

যারা রাষ্ট্র চালাতেন তারা ভুলে গিয়েছিলেন একদা জনগণও তাদের সাহস আর প্রেরণা যোগাতো। কঠিন সময়ের পথ নাটক গান বা প্রতিবাদী কবিতা ছড়া তাদের আর ভালো লাগতো না। ফলে যুক্ত হতে লাগলো সভাকবির দল। একসময় আস্তে আস্তে ভাঁটা পড়ে গেল সবকিছুতে। অথচ আমরা বিশ্ব ইতিহাসে দেখি ফরাসী রুশ বা যে কোন বিপ্লবে সাহিত্য শিল্পই ছিল পুরোভাগে। একা ভিক্টর হুগো কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন জগত। আমাদের মানিক বন্দোপাধ্যায় বা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ কম কিসে?

হলো না। আর হলো না এসব। প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেলো। আমরা দেখলাম আর চুপ থাকলাম। আমরা ভুলে গেলাম এভাবে চললে সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি মারা যাবে। বাঁচলেও জীবন্মৃত হয়ে বাঁচবে যার ফোঁস আছে কিন্তু বিষ নাই। এমন সংস্কৃতি কি আমরা চেয়েছিলাম? যে আদর্শ মূল্যবোধ আর ভাবনা বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রাষ্ট্রপিতা ও মহান ভাষা আন্দোলন দিয়েছিল তার সর্বনাশ করতে পিছপা হন নি কেউ। আজ সারাদেশে যে সংকট তা থেকে উত্তরণের জন্য আপনি আর যাই করেন শিল্প সংস্কৃতির কাছে যেতে পারেন? কারণ তার দুয়ারে তালা। সে তালা খোলার সময় এসেছে। যত বৈরী হোক সময়ই উত্তর দেবে। আমার ধারণা আমার বিশ্বাস প্রকৃতি দেশ আর মাটি মিলে যে সংস্কৃতি তার বিনাশ নাইল তার দুঃসময় থাকতে পারে কিন্তু হনন হয় না। আমাদের দেশ ও জাতি গান বাজনা নাটক কবিতা ছাড়া কীভাবে বাঁচবে? এদেশ ওদেশ বা নানা দেশের থেকে ধার নিয়ে তার চলবে না। তোলা দুধে শিশু বাঁচে না, তোলা ধার করা কিছুতে সংস্কৃতিও বাঁচবে না। শেকড়ে ফিরুন। দেশের মাটির গন্ধ মাখা ঐতিহ্য আদর্শে মন দিন। দুয়ার খুলে যাবে। তখন আবার সংস্কৃতি পথ দেখাবে দয়াকরে তোষামোদী আর স্তাবকতা রোধ করুন। শিল্প স্বাধীন, সে কোন রাজা বাদশার ধার ধারে না। জনগণই তার মালিক। লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, কবি ও সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলালদিয়া কনটেনার টার্মিনাল : বাংলাদেশের বন্দরের নতুন অধ্যায়
পরবর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল