দূরের দুরবিনে

ফুটবল : উত্তেজনা, শিষ্টাচার ও জয় পরাজয়

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

বহুধা বিভক্ত পৃথিবী গোলাকার কি না এ নিয়ে তর্ক আছে। আমরা ভূগোলে পড়েছি দুনিয়া আসলে গোল না কমলা লেবুর মতো চ্যাপটা। সে গোল হোক আর না হোক এখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের মনে মুখে শুধু একটাই কথা, গোল হয়েছে? কে দিয়েছে? কয় গোল হয়েছে?

বাংলাদেশ বা বিশ্বে বাংলাদেশের বাঙালিদের আবেগ দেখার মতো। আমি বলার কে? স্বয়ং ফিফা মেনে নিয়েছে। আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের মানুষ, সরকার মিডিয়া জেনে গিয়েছে। মেনে নিয়েছে এই দেশটি তাদের ফুটবল আবেগের সমান অংশীদার। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের তারুণ্যের সাথে মিলে ভোর বেলা খেলা উদযাপন করেন। এও দেখছি আমরা। এটা কি শুধুই সমর্থন? না এই উত্তেজনার পেছনে আছে নিজেদের বড় হবার উচ্চাশা?

একটা সময় ছিল যখন আমরা ফুটবলের বাইরে চিন্তাই করতে পারতাম না। ঢাকা মোহামেডান আর আবাহনী ছিল এদেশের মানুষের প্রাণস্পন্দন। ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন ওয়ার্ন্ডাসের মতো নামী দামী ক্লাব। ফুটবল বাংলাদেশের যে আবেগ অনুভূতিকে ধারণ করতো তার সিকিভাগ ও পারেনি ক্রিকেট। মূলত ক্রিকেট একটি অভিজাত খেলা। আমি বলতে বাধ্য ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ মিলে তার মান অনেকটা নামিয়ে এনেছে। এককালে টেস্ট ক্রিকেট মানেই ছিল অভিজাত ব্যাপার। আমরা সবচেয়ে ভালো সার্ট প্যান্ট পরে বাড়ির ফ্লাস্কে চা ভরে নিয়ে ব্যাগে খাবার ঢুকিয়ে দেখতে যেতাম তিন দিনের ম্যাচ। ফলাফল অনেক সময় হতোই না। কিন্তু তার ভেতরও ছিল হৃদয় আর মনের আকুতি। মূলত কলকাতার ইডেন গার্ডেনে যেসব বনেদী ম্যাচ হতো তার ঢেউ এসে আচড়ে পড়তো বেতার তরঙ্গে। কালক্রমে সে সব গিয়ে খালি পেশীর আস্ফালন যে যত জোরে বল হাঁকাতে পারে সে তত বড় খেলোয়াড়। পরে এর সাথে টাকা পয়সা আর পাওয়ার গেইম যুক্ত হয়ে এর বারোটা বাজার পথে।

ফুটবলে টাকা পয়সা বেশি। কিন্তু দেশও বেশি। দুনিয়ার প্রায় সব কটা দেশই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে থাকে। এতগুলো দেশ একসাথে থাকলে অঘটন দু একটা হলেও ঘটনাই বেশি হয়। প্রতি চার বছর পর বাংলাদেশের তারুণ্যও নতুন আশা আর স্বপ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পার্থক্য একটাই সভ্য নামে পরিচিত দেশগুলোর সমর্থকরা রাস্তাঘাটে ভিড় করে না। রাত দুপুরে বা ভোর রাতে কারো ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে না। কারণ সভ্য সমাজে সবাই জানে কার কি দায়িত্ব আর কার কি কর্তব্য। আপনি খেলা দেখবেন আনন্দ করবেন বলে হার্টের রোগি ঘুমাতে পারবেন না? আপনি আনন্দ করবেন বলে শিশু ও তার মা নির্ঘুম থাকবেন? এটা ভদ্র সমাজ হতে দেয় না।

আমি এখন যেদেশে বসে এই লেখা লিখছি সেদেশটি এবারের বিশ্বকাপের মূল পর্বে এখনো লড়াইরত। টিকবে কি টিকবে না তার বিচারক সময়। কিন্তু আমাদের অস্ট্রেলিয়া সমানে সমান লড়াই করে যাচ্ছে। মাত্র ২ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার দেশ। অথচ প্রায় প্রতি খেলায় তার অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। ফুটবল ক্রিকেট রাগবি ব্যাডমিন্টন হকি সব খেলাতেই অস্ট্রেলিয়া আছে। সামনের কাতারে তার অবস্থান। এটা কি ভাবে সম্ভব হয়েছে? সম্ভাবনার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করে এরা। সন্ধ্যার পর হিম শীতে যখন হাঁটতে বের হই বা গাড়ি নিয়ে কোথাও যাই বড় বড় মাঠে প্র্যাকটিসরত তরুণদের চোখে পড়বেই। এই যে নীরব ও নিরন্তর অনুশীলন সেখান থেকেই উঠে আসে এগারজন খেলোয়াড়।

বলছিলাম হৈ হৈ করার কথা। খেলা দেখেন না এমন অস্ট্রেলিয়ান বিরল। সবাই যার যার মতো সময় করে টিভি সেটের সামনে বসে খেলা দেখেন। যাদের বয়স কম যারা অজি অজি বলে হৈ হৈ করে তার তবে কোথায়? তারাও আছে। শপিং মল বা পার্কের পাশে কিংবা আবাসন এলাকার বাইরে যেখানে যেখানে বড় বড় পর্দা লাগানো হয়েছে সেখানে বসেই খেলা দেখে তারা। তা ছাড়া পাব রেস্তেরাঁ তো আছেই। পাবে এক গ্লাস বিয়ার আর পর্দার খেলা নিয়ে হৈ চৈ এটাই এদেশের কালচার। যে কথা বলছিলাম আনন্দে চিৎকার পরাজয়ে বেদনা সব আছে কিন্তু মার মার কাট কাট নাই। নাই রাত্রি ভেদ করা উল্লাস। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ সে ভাবনা অবান্তর। মূল কথা হলো আনন্দ ও পরিমিত আর সিভিক সেন্স বা নাগরিক সভ্যতা মেপে চলে।

বলছি আমাদের দেশের তারুণ্যের কথা। এই যে এক মাস তারা ফুটবলে মজে আছে এতে করে মারামারি হানাহানি বা অপরাধের মাত্রা কমে যায়। কারণ যারা এসবের সাথে জড়িত তারাও এসে যোগ দেয় তারুণ্যের সাথে। নির্মল আনন্দ আর উত্তেজনায় পার হয়ে যায় মাস। একেই বলে ক্রীড়ার শক্তি। আমরা যে কথায় কথায় বলি, খেলাধুলা মানুষকে সুস্থ রাখে ভালো রাখে এটা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমাদের দেশে নানাবিধ অনাচার আর রাজনৈতিক তিক্ততা সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে। মানুষ মিডিয়া খুললেই দেখে মারামারি আর প্রতিহিংসার খবর। সত্যি কথা বলতে কি আমি মাঝে মাঝে ভাবি এত নেগেটিভ খবরে ঠাসা সমাজে শিশু কিশোররা ভালো থাকে কি ভাবে? কোন মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে তারা? কি শিখছে কি জানছে?

তার চেয়ে ঢের ভালো পরের দেশের গর্বকে নিজের করে নেয়া। তাছাড়া খেলোয়াড়েরা দেশের জন্য খেলে বটে কিন্তু তারা আসলে পৃথিবীর সবার। একজন মেসি এমবাপ্পে বা রোনালদো কিংবা নেইমার কেবলমাত্র তাদের দল বা দেশের কেউ না। তাদের জয় পরাজয়ে দুনিয়ার কোটি কোটিমানুষের সুখ দুঃখ এমন কি জীবন ও জড়িয়ে আছে। একটা কথা মানতেই হবে বিশ্বকাপ ফুটবল যে উন্মাদনা আর উত্তেজনা নিয়ে আসে তা আর কোন খেলায় দেখা যায় না। এবং তা সম্ভবও না। আমরা বাংলাদেশের বাঙালি আমাদের মন প্রাণ ধ্যানে স্বদেশ। বাঙালির ফুটবল প্রেম এক মাস পেরিয়ে গতিশীল থাকুক আমাদের খেলার জগতে ফুটবল আবার ফিরে আসুক এবং দেশকে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত দিক তাহলেই সব উত্তেজনা একটা গতিপথ পাবে। আমরা সে সময়ের জন্য ধৈর্য ধরে থাকব। যে জিতুক আর হারুক ফুটবল কখনো হারে না।

লেখক : সিডনি প্রবাসী সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমার শহর, আমার দায়িত্ব : পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রামের প্রত্যয়
পরবর্তী নিবন্ধদিব্যদৃষ্টি কল্যাণ ট্রাস্ট কেন্দ্রীয় কমিটির অভিষেক