দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হংকংয়ের দ্য পিকের উপর থেকে শেষবারের মতো নিচে দেখলাম। হয়তো আর কখনো আসা হবে না। তাই ক্যামেরার পাশাপাশি হৃদয় দিয়েও ছবি তুলে নিচ্ছিলাম। জীবনে প্রকৃতির বহুরূপ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, বহুকিছুই দেখেছি। দ্য পিকও আগে দেখেছি। তবে এবার যেনো অনেকটা অন্যরকম লাগছিলো। কী ভয়ংকর রূপ! নিচে ভিক্টোরিয়া হারবার নীল জলরাশী নিয়ে হাতছানী দিচ্ছে। আর দু’দিকে শহরের সুউচ্চ সব আকাশছোঁয়া ভবন। এক পাশে হংকং আইল্যান্ডের সুউচ্চ ভবন, অন্য পাশে কাউলুন। আর মাঝখানে ব্যস্ত জলপথে একের পর এক জাহাজ, ফেরি ও নৌযান চলাচল করছে। সূর্যের আলোতে ভিক্টোরিয়ার জলরাশী চিকচিক করছে, জাহাজগুলোর গা থেকে সূর্যরশ্মি যেনো ঠিকরে ঠিকরে বেরুচ্ছে। দূরের সুউচ্চ ভবনগুলোও যেনো নীলা পাথরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে!

আরো কিছুক্ষণ স্কাই টেরেস ৪২৮ এ বসে থাকার ইচ্ছে করছিলো। ইচ্ছে করছিলো, শুধু দিনই নয়, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতেও এখানে বসে থাকতে। কিন্তু ইয়াস এবং টিপু ভাইয়ের কথার জের ধরে বললাম, চলেন যাই। নিচে নেমে অন্য কোনদিকে ঘুরি, অন্যকিছুও দেখে নিই। আর যে কখন আসা হবে বা আদৌ হবে কিনা তাতো জানি না।

টিপু ভাই বললেন, অবশ্যই আসা হবে, আমরা যতদিন আছি ততদিনই আসবেন। কিন্তু ভিক্টোরিয়া হারবার না ছুঁয়েই কী ঘরে ফিরবেন? আমি হাসলাম। বললাম, এমন রূপসীকে ছুঁয়ে দেখাতো ভাগ্যের ব্যাপার। চলেন, ভাগ্য কতটুকু ফেভার করে দেখে নিই! দ্য পিক থেকে নিচে নামার বেশ কয়েকটি পথ থাকলেও আমরা পিক ট্রামেই নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ ওঠার সময় টিপু ভাই আসা–যাওয়ার টিকেট একইসাথে করে নিয়েছেন। ঐতিহাসিক পিক ট্রাম সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ট্রামে চড়ে একেবারে পাহাড়ের শীর্ষে, আবার শীর্ষ থেকে পাদদেশে। ট্রামটি স্বাভাবিকভাবেই চলে, তবে প্রথম দেখায় মনে হয় এটি বুঝি পাহাড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে। একটু এদিক–ওদিক হলেই স্বর্গদর্শন সময়ের ব্যাপার মাত্র!

পিক ট্রামটি এতোই রোমাঞ্চকর যে, এটির ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নিতে ইচ্ছে হলো। খবর নিয়ে যা জানলাম তাতে জানা গেলো যে, এটি চালু হয়েছে ১৮৮৮ সালে। হংকংয়ের অতি প্রাচীন এই ট্রামে কোনদিন বড় ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। যাত্রী নিয়ে উল্টে পড়েনি, ক্যাবল ছিঁড়ে নিচে গড়িয়ে যায়নি। তবে কয়েকদফায় ভারী বৃষ্টিতে ট্যাক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ট্রাম বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের আক্রমণে ট্রামের ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তখন চার বছর ট্রাম বন্ধ ছিল। এরপর থেকে ট্রামটি আর কখনো দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়নি। টুকটাক মেরামত এবং সংস্কার কাজের জন্য দুচারদিনের জন্য বন্ধ থাকলেও তা হংকংয়ের পর্যটনে তেমন কোন প্রভাব ফেলেনি।

আমরা ট্রামে চড়লাম। আবারো সেই রোমাঞ্চ, সেই উত্তেজনা। ট্রাম চলতে শুরু করলো, মানে নিচের দিকে গড়াতে শুরু করলো। খটাখট আওয়াজ করতে করতে ট্রামটি যতই এগুচ্ছিলো আমরা আকাশ থেকে ততই মাটির কাছাকাছি নেমে আসছিলাম। প্রায় ১.২৭ কিলোমিটারের খাড়া পথ পেরিয়ে ট্রামটি মিনিট দশেকের মধ্যে নিচে নেমে আসলো।

হংকংয়ে এসে ভিক্টোরিয়া হারবার না দেখলে হংকং দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গতবার আমার বন্ধু ইউছুপ আলী ভাই কথাটি বলেছিলেন। এবার ইউছুপ ভাই নেই। ওনার পুত্র ইয়াস এবং ভায়রা টিপু ভাই আমাকে হংকংয়ে ঘুরাচ্ছেন। টিপু ভাই বললেন, চলেন, ভিক্টোরিয়ায় যাই। আমার তো কোনকিছুতেই আপত্তি নেই। সাথে সাথে মাথা নাড়লাম। আকাশ থেকে ভিক্টোরিয়া হারবার দেখেছি, এখন কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখবো। ব্যাপারটি মন্দ হবে না। একইদিনে মাত্র ঘন্টা কয়েকের মধ্যে ভিক্টোরিয়াকে দুইভাবে দেখা হবে, হংকংকেও দেখা হবে দুইভাবে।

দ্য পিকের আকাশছোঁয়া উচ্চতা, স্কাই টেরেস ৪২৮ থেকে দেখা অসীম নগরী এবং পিক ট্রামে পাহাড় বেয়ে নেমে আসার রোমাঞ্চ শেষ করে এবার আমাদের গন্তব্য ভিক্টোরিয়া হারবার। পিক ট্রাম থেকে নেমে গার্ডেন রোড ধরে সেন্ট্রালের দিকে এগোতে এগোতে মনে হলো, একই সঙ্গে পাহাড়, সমুদ্র আর আকাশ ছোঁয়া সব ভবনের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা দেয়া নীল আকাশ নিয়ে শহরটি অন্যরকম। একদিকে সুউচ্চ ভবনের সারি, অন্যদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি। আর মাঝখানে ব্যস্ত নগরজীবন! কী যে দারুণ এক কম্বিনেশন!

টিপু ভাই বললেন, আমরা এখানে থাকি। দেখতে দেখতে আমাদের কাছে কোনকিছুরই আর বাড়তি আবেদন নেই। তবে পর্যটকেরা বলেন, ভিক্টোরিয়া হারবারকে সবচেয়ে কাছ থেকে, সবচেয়ে আপন করে দেখার সবচেয়ে সহজ ও অসাধারণ মাধ্যম হলো স্টার ফেরিতে চড়া। এই ফেরিতে চড়ে ভিক্টোরিয়া হারবারের বুক চিরে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার মাঝেই রয়েছে অপার আনন্দ। আমার তো বরাবরই কোন কিছুতেই আপত্তি নেই। টিপু ভাই টিকেট করে আনলেন।

সেন্ট্রাল থেকে স্টার ফেরি ঘাটের দিকে এগুতেই মনে হলো শহরের চেহারাটা পাল্টে যাচ্ছে। কংক্রিটের জঙ্গল যেনো ধীরে ধীরে উবে যায়, সামনে দুহাত প্রসারিত করে আহ্বান জানায় বিস্তৃত ভিক্টোরিয়া হারবার। ওপারে কাউলুনের আকাশরেখা। মাঝখানে নীল জলরাশি সামনে নিয়ে দুপাড়ের সুউচ্চ ভবনগুলো যেনো গল্প করছে, একে অন্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝের নীল জলরাশির বুক চিরে চলছে ফেরি, মালবাহী জাহাজ, ছোট ছোট নৌযান ও নানা ধরনের বোট।

স্টার ফেরি ঘাটে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হারবারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হংকংয়ের এই দৃশ্য গতবারও দেখেছি, ছবিও অসংখ্যবার নজর কেড়েছে, কিন্তু বাস্তবের রূপের কাছে ছবির সেই মোহনীয় রূপ যেনো অনেকটা মলিন।

আমরা স্টার ফেরিতে চড়ে বসলাম। আরো অনেকেই আমাদের সাথে ওঠলেন। এতো লোক নিয়ে ফেরিটি ঠিকঠাকভাবে ওপারে পৌঁছাতে পারবে তো! কথাটি কানে কানে টিপু ভাইকে বলতেই তিনি শব্দ করে হাসলেন। বললেন, এটি হংকং! এই স্টার ফেরি চলছে একশ’ বছরের বেশি কাল ধরে। ভিক্টোরিয়া হারবারের দুই তীরকে যুক্ত করে রেখেছে এই ফেরি। তিনি বললেন, ভিক্টোরিয়া হারবারের উপর ব্রিজ আছে, নিচে টানেল আছে। দুপাড়কে আজ বহুভাবে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মেট্রো বলেন, টানেল বলেন, গাড়ি বলেন কোনকিছুই স্টার ফেরির আবেদন কমাতে পারেনি। বরং আপনাদের মতো যারা ঘুরতে আসেন, তারা অবশ্যই স্টার ফেরি মিস করেন না।

আধুনিক মেট্রো, ঝকঝকে গাড়ি কিংবা অগুনতি ফ্লাইওভারের ব্যস্ততার বাইরে হংকংয়ের শহরের বুকে নৌভ্রমণ! অবশ্য, এটি নৌকা নয়, অনেকটা ইয়টের মতো। ৩/৪ শ লোক ফেরির উপরে এবং ডেকে। আমাদের ফেরি চলতে শুরু করলো। আমরা জানালার পাশের একটি আসনে পাশাপাশি বসেছি। ইঞ্জিনে কিছুটা আওয়াজ তুলে ভেঁপু বাজিয়ে আমাদের ফেরি ঘাট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলো। আরো কয়েকটি ফেরিও প্রায় একই সময়ে ঘাট ছাড়ছিলো। ধীরে ধীরে ঘাট পেছনে সরে যাচ্ছে। সামনে খুলে যাচ্ছে ভিক্টোরিয়া হারবার। পেছনে সেন্ট্রালের সুউচ্চ ভবনগুলো ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, আর সামনে কাউলুনের স্কাইলাইন চোখের সামনে আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলো।

ফেরির ডেকে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালাম। এক পাশে সেন্ট্রাল। আকাশ ছুঁতে চাওয়া ভবনগুলোর সারি। কাঁচের দেয়ালে সূর্যের আলো ঝলমল করছে। ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হোটেল, শপিং মল–আধুনিক অর্থনীতির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। অন্য পাশে কাউলুন। তার নিজস্ব ব্যস্ততা, ভবনের সারি, রাস্তা আর মানুষের চলাচল।

টিপু ভাই আমাকে নিয়ে ফেরির দোতলার খোলা ডেকে চলে গেলেন। ওখান থেকে বিস্তৃত নীল জলরাশির পাশাপাশি দুপাড়ের স্কাইলাইন দেখা যাচ্ছিলো।

আমাদের ফেরি চলছিল। ফেরির সামনে–পেছনে ছোট–বড় নানা নৌযান। কোনোটি দ্রুত চলে যাচ্ছে, কোনোটি ধীর গতিতে। দূরে বড় কার্গো জাহাজ। মাঝেমধ্যে ছোট টাগবোট ছুটে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে হারবারটির অন্যরকমের এক ব্যস্ততা কাছ থেকে দেখা হলো।

একটি নোনতা হাওয়া যেনো গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। হারবারের জলে ঢেউয়ের মৃদু ওঠানামা, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া জাহাজের ভেঁপু। মাথার ওপর চমৎকার নীল আকাশ। সবকিছু মিলে অদ্ভুদ এক মুগ্ধতায় আমাদের নৌভ্রমণ চলতে লাগলো। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকা
পরবর্তী নিবন্ধঐতিহ্য-সন্ধানী নিরলস সাধক-আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ