(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
দারুণ একটি ঘুম হলো। সকালে ঘুম থেকে জাগার পর মনটি কোন কারণ ছাড়াই ফুরফুরে মনে হলো। আমার রুমমেট লায়ন বিজয় শেখর দাশ তখনো ঘুমাচ্ছিলেন। জানালার বাইরে দেখি, শহরটি ধীরে ধীরে সোনালী আলোয় ভরে উঠছে। একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার নীল আকাশ। কমবয়সী সূর্যের কোমল আলো ধারেকাছের কাঁচের বহুতল ভবনগুলোর গায়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বীকার করতে অসুবিধা নেই যে, সিডনি আসলেই একটি সুন্দর শহর।
আমি ফ্রেশ হয়ে ওনাকে জাগালাম। ফোন করলাম আমাদের ভ্রমনসঙ্গী লায়ন ফজলে করিম ভাইকে। সবাইকে নিয়ে ব্যুফে নাস্তা করতে নিচে নামলাম। বিদেশে ভ্রমনকালে নতুন নতুন জায়গা দেখার যেমন আনন্দ থাকে, তেমনি নতুন কিছু খাওয়ারও। একটি দেশের খাদ্য সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে ব্যুফে ব্রেকফাস্টের কোন বিকল্প নেই। কারণ সব ধরনের খাবারই সেখানে থাকে। আপনার ইচ্ছে হলে প্লেটে নেন বা না নেন দেখতে কিংবা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়না। কোন খাবারটি কি দিয়ে তৈরি হয়েছে তাও জেনে নেয়া যায়। প্রতিটি খাবারে ইংরেজিতে নাম লিখে রাখা থাকে।
ডালিয়া ভাবীসহ আমরা চারজন রেস্টুরেন্টে পৌঁছলাম। প্রবেশমুখেই এক তরুণী হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। তার হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। অতিথিকে স্বাগত জানানোর মধ্যে যেন এক আন্তরিক আনন্দ। আমাদের রুম নম্বর জানতে চাইলেন। তার হাতে থাকা বোর্ডের উপর সাঁটনো কাগজে টিক মার্ক দিলেন। আমাদেরকে ভিতরে যেতে অনুরোধ করলেন। একটুখানি এগুতেই আরেক তরুণী আমাদের স্বাগত জানালেন। তিনি আমরা চারজন শুনে নিয়ে জানালার ধারে একটি টেবিলে বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেখান থেকে শহরের ব্যস্ত সড়ক আর দূরের উঁচু ভবনগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সকালের আলোয় ভরে থাকা সিডনিকে অনন্য লাগছিল।
টেবিল ঠিকঠাক হওয়ার পর আমরা খাবার নিতে গেলাম। আরো অনেকেই খাবার নিচ্ছেন। রেস্টুরেন্টের হেথায় হোথায় বসে অনেকেই খাবার খাচ্ছেন। নানা দেশের মানুষ, নানা পাতে একই রেস্টুরেন্টের খাবার! গত তিনদিন ধরে এই হোটেলে রয়েছি। প্রতিদিনই সকালে ব্যুফে ব্রেকফাস্ট করি। একটি বিষয় আমাকে বিস্মিত করতো যে, এতো এত্তো গরম গরম খাবার তারা কখন রান্না করে! এত বৈচিত্র্যময় সকালের নাশতা! রেস্টুরেন্টের মাঝামাঝি জায়গায় কয়েকটি কাউন্টারে খাবারগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটি কাউন্টারকে এক একটি অঞ্চলের রান্নাঘর বলে মনে হচ্ছিলো।
এক পাশে বিভিন্ন ধরনের তাজা ফল। রসালো তরমুজ, মিষ্টি আনারস, কিউই, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি, আঙুর, কমলা, আপেল, নাশপাতি, কলাসহ নানা ফল। ফলগুলোর রঙের বাহারই বলে দিচ্ছিলো এগুলো টাটকা, যেনো এই সাতসকালে বাগান থেকে তুলে আনা হয়েছে।
আরেক পাশে নানা ধরনের রুটি। সাদা, ব্রাউন, মাল্টিগ্রেইন, সাওয়ারডো, বাগেট, ক্রসঁ, ড্যানিশ পেস্ট্রি, বেগেল, মাফিন–কত নাম, কত স্বাদ! গরম টোস্টারের পাশে রাখা ছিল বিভিন্ন ধরনের মাখন, জ্যাম, মধু ও পিনাট বাটার। সদ্য বেক করা রুটির সুবাস পুরো রেস্টুরেন্ট জুড়ে!
এরপর চোখ গেল গরম খাবারের কাউন্টারে। ডিম রান্নার জন্য আলাদা লাইভ স্টেশন। একজন শেফ অতিথির পছন্দমতো অমলেট, পোচ, স্ক্র্যাম্বলড এগ কিংবা ফ্রাইড এগ তৈরি করে দিচ্ছেন। অমলেটে কী কী উপকরণ দেবেন–পেঁয়াজ, মাশরুম, টমেটো, চিজ, ক্যাপসিকাম, পালং শাক কিংবা স্মোকড স্যামন। আপনি যা যা বলবেন তা দিয়ে ডিম তৈরি করে দেবে।
পাশেই ছিল গ্রিল করা টমেটো, সতে করা মাশরুম, বেকড বিনস, হ্যাশ ব্রাউন, চিকেন সসেজ, টার্কি, গ্রিলড সবজি এবং নানা ধরনের আলুর পদ। যারা নিরামিষভোজী, তাদের জন্যও ছিল সমান সমৃদ্ধ আয়োজন।
এক কোনে চোখে পড়ল নানা ধরনের সিরিয়াল, কর্নফ্লেক্স, মুসলি, ওটস, চিয়া সিড, বাদাম, শুকনো ফল এবং বিভিন্ন স্বাদের দই। দুধও ছিল কয়েক ধরনের–গরুর দুধ, স্কিমড মিল্ক, সয়া মিল্ক, বাদামের দুধ ও ওট মিল্ক। খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যকে কতটা গুরুত্ব দিলে এতো আয়োজন করা হয় তা চিন্তা করছিলাম।
সী ফুডের বিশাল যোগান। স্মোকড স্যামন, বিভিন্ন ধরনের চিজ, জলপাই, ক্যাপারস এবং ঠান্ডা মাংসের স্লাাইস সাজানো ছিল শিল্পকর্মের মতো। পাশেই নানা রকম সালাদ, লেটুস, শসা, চেরি টমেটো ও অলিভ অয়েল।
কয়েক ধরণের ফলের জুসও জার ভরে রাখা হয়েছে। কল টিপে গ্লাস ভর্তি করলেই হলো। আমি দুই ধরণের জুস নিয়ে টেবিলে রাখলাম। পরে প্লেটে আরো কয়েক ধরণের খাবার নিলাম। তুলতুলে নরম ক্রসঁ, টোস্ট করা পাউরুট, বিভিন্ন ধরণের মিশ্রনে ডিম, গ্রিলড মাশরুম, কয়েক টুকরো ফল নিয়ে বসলাম। সাতসকালে মাংসজাতীয় আইটেম ভালো থাকে না। তবে এই ধরণের হোটেলে এলে স্মোকড স্যামন আমাকে খুবই টানে।
আমরা চারজনই রয়ে সয়ে খাবার খাচ্ছিলাম। সকালে নাস্তাটা ইচ্ছে করেই বেশি করি, যাতে দুপুরের আগে আর ক্ষুধা না লাগে। শেষে কফি খাই, আড্ডা জমলে কফি দুই কাপও হয়ে যায়।
আশে পাশে অনেকেই খাবার খাচ্ছেন। প্লেটের উপর উপচে পড়ছে খাবার, কিন্তু খাচ্ছেন অল্প। আবার অনেকেই খাবার ভর্তি প্লেট বাদ দিয়ে নতুন করে প্লেট নিয়ে খাবার নিচ্ছেন। ওই প্লেটেরও সব খাবার খাচ্ছেন না, কিছুটা খেয়ে বাকিটা টেবিলে ফেলে রাখছেন। ওয়েটারেরা এসে খাবার ভর্তি প্লেট তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, ফেলে দিচ্ছেন ডাস্টবিনে।
বিষয়টি আমাকে খুবই কষ্ট দেয়। একজীবনে এতো বেশি তারকাখচিত হোটেলে সকালের ব্যুফে ব্রেকফাস্ট করেছি যে, আমার বাকি জীবনে আর কোনদিন এমন হোটেলে থাকতে বা খেতে না পারলেও কোন আফসোস থাকবে না। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ব্যুফে ব্রেকফাস্টে এই দৃশ্যটি কমন। প্রচুর খাবার নষ্ট। আমি জ্ঞাতসারে কোনদিনই আমার কোন খাবার নষ্ট করি না। ঠিক ততটুকুই আমি নিই,যতটুকু খেতে পারি। এসব রেস্তোরায় শুধু সকালের নাস্তার সময় যে পরিমান খাবার নষ্ট হয়, তা দিয়ে অনায়াসে এক দেড়শ’ লোকের সকালের নাস্তা কিংবা দুপুরের পেটের ক্ষুধা মিটানো সম্ভব। বিপুল পরিমান খাবার এরা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, যা চলে যায় ময়লার ভাগাড়ে। অথচ পৃথিবীর দেশে দেশে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে থাকে। অনাহারে থাকার কষ্টে শিশুরা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, মা বাবার চোখে পানি ঝরে, কিন্তু খাবার জুটে না।
ব্যুফে ব্রেকফাস্টে আপনি যত ইচ্ছে খাবার তুলে নিতে পারেন, একটির পর একটি প্লেটও মাখাতে পারেন। রেস্টুরেন্টের পক্ষ থেকে কোন ধরণের আপত্তি করা হবে না। তবে আমার মনে হয়, ব্যুফে মানেই যত খুশি প্লেটে তুলে নেওয়া নয়, যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই নেওয়া। এটাই সভ্যতা।
আমাদের টেবিলে এক তরুণী কাজ করছিলেন। কোনদেশের বুঝতে পারছিলাম না। টেবিল থেকে উঠে নিজে বানিয়ে কফি আনতে ইচ্ছে করছিল না। আমি মেয়েটিকে এক কাপ কফি এনে দিতে পারবেন কিনা জানতে চাইলাম। তরুণী অতি বিনয়ী এবং হাসিমুখে সম্মতি জানালেন।
অস্ট্রেলিয়ার কফি এবং দুধ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। বিখ্যাত কফির সাথে অতিবিখ্যাত দুধের মিশ্রয়ে যেটি তৈরি করা হয়েছে প্রথম চুমুকেই সেটি শরীর মনে একইসাথে নিজের স্বকীয়তা জানিয়ে দিল। সুগন্ধ, ঘনত্ব আর স্বাদের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য। আমি মেয়েটিকে কফি দারুণ হয়েছে বলে ধন্যবাদ দিলাম। তিনি
আমাদের টেবিলে বাকি তিনজনকেও কফি এনে দিলেন।
জানালার বাইরে অফিসগামী মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ছিল। কেউ দ্রুত হাঁটছেন, কেউ সাইকেলে, কেউ ট্রামে, কেউ ট্রেনে। আমাদের কোন ব্যস্ততা নেই। আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে শহরের ব্যস্ততা এবং সৌন্দর্য দেখছিলাম। একই সাথে জমিয়ে আড্ডাও চলছিল।
রেস্টুরেন্টে আমাদের সাথে ঢাকা থেকে আসা আরো অনেকেই নাস্তা করছেন। কেউ কেউ এসে হাত মিলাচ্ছেন, কেউবা শুভেচ্ছা বিনিময়। আমাদের চারজনকে ট্যুর অপারেটরের সাথে না দেখে কেউ কেউ বিস্ময়ও প্রকাশ করলেন। নিজেদের মতো করে ঘুরছি বলে আমরা দায় সারলাম।
আমার চারপাশে বিভিন্ন দেশের মানুষ। পাশের টেবিলে জাপানি একটি পরিবার, আরেক পাশে জার্মান দম্পতি, একটু দূরে ভারতীয় কয়েকজন পর্যটক। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, পোশাক আলাদা–কিন্তু সকালের খাবারের টেবিলে সবাই যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত। ইন্টারন্যাশনাল ব্রেকফাস্ট!
খেয়াল করলাম, কেউ উচ্চঃস্বরে কথা বলছেন না। শিশুদেরও শেখানো হয়েছে অন্যের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবতে। কর্মীরা নিঃশব্দে প্লেট সরিয়ে নিচ্ছেন, টেবিল পরিষ্কার করছেন, নতুন খাবার সাজিয়ে রাখছেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, নেই হুড়োহুড়ি। সবকিছু যেনো অমুক নিয়মেই আবর্তিত হচ্ছে! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












