সীতাকুণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ওঠা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে গত ১২ বছরে ১৬১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন গেছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একটু সচেতন হলেই এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যেত। গতকাল ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং নামের যে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তারা যদি শুধু বিশেষায়িত মাক্স ব্যবহার করতেন, তাহলে এতগুলো মানুষ মারা যেতেন না। গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে ওই ইয়ার্ডে বিশেষায়িত মাক্স মজুদ রয়েছে, শুধু শ্রমিকেরা পরেননি বা তাদের পরতে বলা হয়নি।
শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে প্রতি বছরই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখায় দুর্ঘটনার মূল কারণ বলেও মনে করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির হিসেবে, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬১ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৯ জন, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ১৫ জন, ২০১৮ সালে ২০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ১১ জন, ২০২১ সালে ১৪ জন, ২০২২ সালে ১০ জন, ২০২৩ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ৩ জন এবং চলতি বছরে মারা গেছে ১৬ জন। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
সংস্থাটির হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন আজাদীকে বলেন, গতকালের দুর্ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ। গত ২৫ বছরে কোনো একটি ইয়ার্ডে এত লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই ইয়ার্ডটি গ্রিন ইয়ার্ড, অথচ শ্রম আইন ভঙ্গ করায় এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বারবার নোটিশ, পরিদর্শন এবং নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এরা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে এখনো অনেক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড মালিকের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে। একটি গ্রিন ইয়ার্ডে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একসঙ্গে এতগুলো শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ কোনো ইয়ার্ডকে ১০০ ভাগ নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তাড়াহুড়া না করে হংকং কনভেনশনের সব নিয়ম ও নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করে জাহাজ রিসাইক্লিং করতে হবে। একই ঘটনায় এত শ্রমিকের প্রাণহানি এ খাতে গুরুতর ও নজিরবিহীন ঘটনা। এই পর্যায়ে এসে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা কেন ঘটবে? তার দায় অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে।
নিয়মিত তদারকির অভাব, শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের চর্চার ঘাটতি এবং দ্রুত জাহাজ ভাঙার প্রবণতা–এসবই এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ বলে মন্তব্য করেন আল শাহীন। এসব অনিরাপদ চর্চা বন্ধ করে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইপসা।
ইপসার পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫টি শিপইয়ার্ড আছে। সেগুলোর মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ড আছে মাত্র চারটি। আরো ৫–৬টি শিপইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। করোনা মহামারির আগে দেশে ১৫০টির বেশি শিপইয়ার্ড ছিল। মহামারির পর তা কমে হয়েছিল ৫৫ থেকে ৬০টি। ডলার সংকট শুরু হওয়ার পর এ ধকল সহ্য করতে না পেরে আরো বেশ কয়েকটি শিপইয়ার্ড বন্ধ হয়ে ১০ থেকে ১৫টিতে এসে ঠেকে। চলতি বছর শিপইয়ার্ড বেড়ে ৩০ থেকে ৩৫টিতে হয়েছে।
সূত্র জানা যায়, গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলোতে অনেক নিয়ম–কানুন মানার কথা। গ্রিন এবং সাধারণ ইয়ার্ডগুলোতে দেখা যায়, তারা সরাসরি শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে জাহাজ কাটার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করে। ওই ঠিকাদার আবার সাব–ঠিকাদার নিয়োগ দেন। ঠিকাদাররা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার জন্য কোনো নিয়ম মানছেন না। নিয়ম না মানার কারণেই এ দুর্ঘটনা। ইয়ার্ডগুলোতে মজুরি বোর্ডের নির্ধারণ করা মজুরি দেওয়া হচ্ছে না শ্রমিকদের। মানা হচ্ছে না শ্রম আইন। রাত ৮টার পর জাহাজ না কাটার জন্য বলা হলেও সেই নির্দেশনাও মানছে না অনেক ইয়ার্ড।
এভাবে একটি সেক্টর চলতে পারে না মন্তব্য করে ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন আজাদীকে বলেন, বিশেষায়িত মাঙ পরলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না। তাদের অফিসে সেই মাঙ সংরক্ষিত আছে, অথচ শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি। এমন একটি জাহাজে কাজে পাঠানোর সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরত্ব দেওয়া উচিত ছিল।









