ডেঙ্গু রুখতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর মেয়রের

চসিকের বিভাগীয় প্রধানবৃন্দ, বিএনসিসিসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সভা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঘন ঘন রূপ বদল নিয়ে উদ্বেগ

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

নগরে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ভাইরাসের ঘন ঘন রূপ বদল (জিনগত পরিবর্তন) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি ভাইরাসের জিনের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণারও আহ্বান জানান। একই সাথে কেবল থেরাপিউটিক (চিকিৎসা) এর ওপর নির্ভর না করে ডেঙ্গু রুখতে আগাম প্রতিরোধমূলক (প্রিভেন্টিভ) ব্যবস্থায় জোর দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের একমাত্র সিটি কর্পোরেশন হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত লার্ভিসাইড ‘বিটিআই’ ব্যবহার করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরে সাফল্য পাওয়ার দাবি করেন মেয়র।

গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সারাদেশে তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিনসহ কর্মকর্তারা। এরপর কর্মসূচিটি চট্টগ্রাম মহানগরীতে সফলভাবে বাস্তবায়নে করণীয় নির্ধারণে চসিকের বিভাগীয় প্রধানবৃন্দ, বিএনসিসিসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সভা করেন। সভায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ভাইরাসের ঘন ঘন রূপ বদল বিষয়ে মন্তব্য করেন মেয়র।

ডা. শাহাদাত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ধরন পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২৪ সালে ডেঙ্গুর পরিমাণ বেশি থাকলেও চিকুনগুনিয়া কম ছিল। ২৫ সালে এসে চিত্র বদলে গিয়ে চিকুনগুনিয়া বাড়ে ও ডেঙ্গু কমে। আবার ২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু বাড়লেও চিকুনগুনিয়া একেবারেই কম। এই যে জিনের তাত্বিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হচ্ছেএর পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আরও গভীর গবেষণা করা প্রয়োজন।

মেয়র প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে বলেন, এডিস মশার লার্ভাকে যদি ধ্বংস করতে হয়, ডেঙ্গুমুক্ত একটি বাংলাদেশ যদি চান, তাহলে দুইভাবে কাজ করতে হবে। একটা হচ্ছে থেরাপিউটিক (চিকিৎসা), আরেকটি হচ্ছে প্রিভেন্টিভ (প্রতিরোধমূলক)। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বারবার প্রিভেন্টিভ মেজারসের কথা বলেছেন। রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। প্রতিরোধই ডেঙ্গু মুক্তির প্রধান উপায়।

ডা. শাহাদাত বলেন, রোগ প্রতিরোধ করতে হলে, প্রিভেন্ট করতে হলে আমাদের কী করতে হবে? তাহলে মূল কাজ হবেএকটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে। যত্রতত্র আমরা ময়লা ফেলব না, প্লাস্টিক ফেলব না, পলিথিন ফেলব না, ককশিট ফেলব না, ডাবের খোসা ফেলব না। চসিকের একক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; নগরবাসীকে সচেতন হয়ে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারলে তবেই আমরা ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ পাব।

তিনি বলেন, এডিসকে একপ্রকার ভিআইপি মশা বলা চলে! তারা কিন্তু নোংরা পানিতে ডিম পাড়ে না, যত স্বচ্ছ আর পরিষ্কার পানি পাবে সেখানেই লার্ভা ছড়াবে। বিশেষ করে ডাবের খোসার ভেতরের মিষ্টি জমা পানি তাদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। তিনি সতর্ক করে বলেন, মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার জমা স্বচ্ছ বা বৃষ্টির পানিতেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এডিস মশার লার্ভা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এমনকি ডাবের খোসার মিষ্টি ও পরিষ্কার পানিতে সবচেয়ে বেশি লার্ভা জন্মায়।

এসময় বাংলাদেশের একমাত্র সিটি কর্পোরেশন হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত লার্ভিসাইড ‘বিটিআই’ ব্যবহার করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পাওয়ার দাবি করেন ডা. শাহাদাত। তিনি জানান, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে আরও সচেতনতা প্রয়োজন।

মেয়র ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৫৩ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজারে। ২০২৪ সালে তা কমে ৪ হাজার ৩০০ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৮০০ জন হয়। চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪২ জনে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৬৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। বিপরীতে উপজেলা পর্যায়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ২২৪ জন এবং মৃত্যু ৬ জন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৯ জন।

সভা শেষে উক্ত কর্মসূচির অংশ হিসেবে থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে বিশেষ পরিচ্ছন্ন ও মশক নিয়ন্ত্রণ ক্রাশ প্রোগ্রামের উদ্বোধন করেন তিনি। ক্রাশ প্রোগ্রামে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, মশার ঔষধ ছিটানো এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম তদারকি করেন মেয়র। এ সময় তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে এ কার্যক্রম সফল করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডকে পরিচ্ছন্ন এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে পদক্ষেপ নিয়েছি। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠ পর্যায়ে এ কার্যক্রম সফল করতে কাজ করবেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সিটি কর্পোরেশনের একার দায়িত্ব নয়। বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা অন্যান্য সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করছি।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। কোতোয়ালী, হালিশহর, বন্দর, আকবরশাহ, বাকলিয়া ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মেয়র বলেন, বৃষ্টির পর নগরের কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। কারণ জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার প্রজনন হতে পারে। এ বিষয়ে নাগরিকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিজের ঘর, নিজের আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিক ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনভেম্বরে নির্বাচন উপযোগী হচ্ছে চট্টগ্রামের ১শ ইউপি