ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে সামনে রেখে ঘোষিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব

চিটাগাং চেম্বারের প্রতিক্রিয়া

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ১২ জুন, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণার মাধ্যমে মহান জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উপস্থাপন করেছেন বলে মন্তব্য করেছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চিটাগাং চেম্বারের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ, আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, বর্তমান সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সহসভাপতি মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন, পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী, আমান উল্লা আল ছগির (ছুট্টু), মোহাম্মদ আকতার পারভেজ, মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, মোঃ জাহিদুল হাসান, আসাদ ইফতেখার, . এস. এম. ইসমাইল খান, ক্যাপ্টেন মোঃ আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, সরোয়ার আলম খান, শহীদুল আলম, মোহাম্মদ শফিউল আলম ও মোঃ সেলিম নুর।

বিশেষ আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞের মধ্যে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদির, চট্টগ্রাম ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট মো. সোলায়মান, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আসাদুজ্জামান (সাগর), আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিঃ চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন, সীকম গ্রুপের সিএফও গোলাম কিবরিয়া, অডিট এন্ড একাউন্টস ফার্ম বাসু ব্যানার্জি নাথ এন্ড কোং এর জিসি পাল, এম. এম. রহমান এন্ড কোং এর সিদ্ধার্থ বড়ুয়া, মো. সবুজ এন্ড কোং এর মোদাচ্ছার আহমেদ সিদ্দিকী, সানম্যান গ্রুপের আরশাদ উল্লাহ, জে এফ লি. এর মনোয়ারুল হক, এম.আর.এইচ দে এন্ড কোম্পানীর সমুন চন্দ্র, কবির গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের মো. নুরুল হুদা সিদ্দিকী, এস.এফ. আহমেদ এন্ড কোং এর মোহামিন আতিক চৌধুরী, জেনারেল সিকিউরিটিজের সাজ্জাদুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম লজিস্টিক্সের এনামুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের মূল্যস্ফীতি কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাপ্লইচেইন ইকোসিস্টেম বজায় রেখে ব্যবসাবান্ধব এবং জনতুষ্টিমূলক বাজেট প্রদান করায় চেম্বারের নেতৃবৃন্দ ধন্যবাদ জানান। জনগণের উপর ভ্যাট ও করের চাপ কমিয়ে করজাল বাড়ানো এবং দেশিবিদেশী উৎস থেকে অর্থ সংস্থানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই বাজেটকে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেন চেম্বার নেতৃবৃন্দ।

বাজেটে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও দেশিবিদেশী বিনিয়োগের জন্য নতুন নীতিমালা নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। ঢাকাচট্টগ্রাম এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন এবং ঢাকাচট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৮০ কিমি কমানোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং মীরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আবাসনসহ সকল ধরণের ইউটিলিটি সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ উপযোগী করার আহ্বান জানান নেতৃবৃন্দ।

বাজেটে মোট ব্যয় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, মোট আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং মোট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস গুরুত্ব দেয়াকে দেশীয় সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন চেম্বার নেতৃবৃন্দ। বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা শিক্ষা খাতকে।

ব্যক্তি করদাতার টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি এবং ব্যাংক স্থিতির ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে এতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হবে। এছাড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির উপকারভোগীদের ভাতার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড জনপ্রতি ২৫০০ টাকা, প্রতিবন্ধী ভাতা, পর্যায়ক্রমে সকল কৃষককে কার্ড প্রদান এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকূফ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়া ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় গমনেচ্ছুদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদান যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বাজেটে কর্পোরেট কর ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করায় অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়ানো এবং কর্পোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা ইতিবাচক। পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানীর করহার শর্তসাপেক্ষে ২২.%, পাবলিকলি ট্রেডেড ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানীর ক্ষেত্রে ৩৭.%, পাবলিকলি ট্রেডেড নয় কোম্পানীর ক্ষেত্রে ৪০%, মোবাইল অপারেটর কোম্পানীর জন্য ৪৫%, বাংলাদেশী অনিবাসী করদাতাদর জন্য ৩০%, ট্রাস্ট ফার্ম ও ব্যক্তিসংগ প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৭.%, সমবায় সমিতি ২০%, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০% করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার ১০% করায় উদ্যোক্তারা শিক্ষা খাতে আগ্রহী হবেন। এছাড়া আমদানিকৃত ১১৩টি পণ্যের রেগুলার ডিউটি প্রত্যাহার, ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ৬৯টি পণ্যের কাস্টমস ডিউটি ২৫% থেকে ১৫% নির্ধারণ, শিশু খাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহ্রাস, সকল মসলা আমদানিতে রেগুলেটরী শুল্ক ও খেজুর আমদানিতে রেগুলেটরী শুল্ক ৫% প্রত্যাহার, পোল্ট্রি, ডেইরী ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করায় মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করেন নেতৃবৃন্দ।

বাজেটে জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং সৌর বিদ্যুতকে উৎসাহিত করতে সোলার প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারীসহ আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রপাতিতে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়বে এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান এবং ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানিতে অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানোর ফলে একদিকে যেমন জ্বালানির উপর চাপ কমবে তেমনি সৌর বিদ্যুৎ শিল্প এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে দেশিবিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। এছাড়া দেশে ক্রমবর্ধমানভাবে সাধারণ মানুষের বাড়ছে প্রাণঘাতি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ। এক্ষেত্রে ক্যান্সার ঔষধ উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানে ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫% অগ্রিম কর মওকূফ করায় সাধারণ রোগীরা স্বস্তি পাবেন।

সরকার আইটি সেক্টরকে উৎসাহিত করতে এবং ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়কে করমুক্ত করা, স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাঙ শূন্য করা, এসএমই উদ্যোক্তাদের টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা এবং ঢাকাচট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোন উৎপাদানমূখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের উপর ১ম বর্ষে ৬০%, ২য় বর্ষে ৪০% হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা প্রদান করায় দেশে তরুণ প্রজন্ম, নারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন স্থানে শিল্প কারখানা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করতে এবং পণ্যজট শূন্য করতে অফডক ও আইসিডি খাত, লজিস্টিঙ, বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করার মাধ্যমে চট্টগ্রামে বন্দরকেন্দ্রিক দেশিবিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে বলেও চট্টগ্রাম চেম্বার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএবারের বাজেট সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব
পরবর্তী নিবন্ধলক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ জরুরি – খলিলুর রহমান