জিয়ার বিদায়ে কেঁদেছিল পুরো বাংলাদেশ

জাহিদুল করিম কচি | সোমবার , ১ জুন, ২০২৬ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ

৩০ মে রাতের শেষ লগ্নে ঘাতকের নিষ্ঠুর হাত দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তাদের কাছ থেকে চিরতরে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

যে জিয়া অসাধারণ প্রাণচাঞ্চল্যের শিক্ষা দিয়ে আত্মবিস্মৃত জাতির প্রাণে কর্মপ্রেরণার আগুন জ্বালাতে চেয়েছিলেন, সেই সম্ভাবনার শিখা নিভে গেছে মাঝপথেই। যার অবস্থান ছিল নির্ভয় দেশপ্রেমের মোহনায়, ধৈর্য ও সততার শৈলশিখরে ছিল তাঁর অকস্মাৎ অবস্থান। সেখান থেকে শতধাবিভক্ত জনগণের বহুমুখী বিপরীত স্রোতকে তিনি মেলাতে চেয়েছিলেন একটি মাত্র প্রবল ও বেগবান জাতীয় ধারায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই নির্মম নিয়তির আঘাতে খণ্ডিত হয়ে যায় তাঁর জীবন।

রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ একসময় হঠাৎ করেই তাঁকে আবিষ্কার করেছিল তাদের উন্নত জীবন, জাতীয় অগ্রগতি ও নতুন সম্ভাবনার অগ্রপথিক হিসেবে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনগণের আশা, আত্মবিশ্বাস ও পরিবর্তনের এক অনন্য প্রতীক। অথচ সেই মানুষগুলোকেই একদিন দেখতে হয়েছিল তাঁর করুণ ও বেদনাবিধুর বিদায়। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে নেমে আসে গভীর শোক ও স্তব্ধতা। অশ্রুসিক্ত জনতার সেই বিদায়ে প্রতিফলিত হয়েছিল এক নেতার প্রতি জনগণের ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধাবোধ।

জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করার পেছনে রয়েছে বহু কারণ। তাঁর সময়ে মানুষ যেমন আশার আলো দেখেছে, তেমনি দেখেছে দুঃসময়ের মেঘও। তাঁর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য মানুষকে দিয়েছে সাহস ও অনুপ্রেরণা। আবার তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করেছে নানা আলোচনারও। কিন্তু আজ তিনি সব হিসাবনিকাশের ঊর্ধ্বে একটি ইতিহাস, একটি প্রেরণা।

সাংবাদিক হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার তিনবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের যতটুকু সান্নিধ্য অন্তরঙ্গতা ও শোভন সান্নিধ্য সহৃদয়তা ও ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব আমি জিয়ার থেকে যা পেয়েছি তা বেশী ছাড়া কম নয়। তবে তিনি সবসময় কম কথা বলতেন।

প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল রেলওয়ে অফিসার্স রেস্ট হাউস, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন এবং বেইলি রোডে সাংবাদিকদের সম্মানে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে। ক্যান্টনমেন্টের সেই সাক্ষাৎ ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গ। আমার সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ও রাজনৈতিক কর্মী কাজী সিরাজ ও বাকশালের ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলার দুই গভর্নর। পরবর্তীতে তাঁরাও জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন।

সেদিনের একটি ঘটনা আমাকে বিস্মিত করেছিল। বিকেল চারটায় আমরা তাঁর বাসভবনে পৌঁছালে এডিসি জানান, আমাদের কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। তখন কাজী সিরাজ বলেন, ফোনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তিনি সময় দিয়েছেন। এরপর এডিসি ভেতরে গিয়ে ফিরে এসে আমাদের অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর আমাদের রাষ্ট্রপতির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। পাশের কক্ষে তখন তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। প্রায় পনেরো মিনিট পর আমাদের ডাক পড়ে। আন্তরিক আলাপের একপর্যায়ে তিনি চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও জানান। কিন্তু সেই বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি। পরদিনই তিনি বিদেশ সফরে চলে যান। সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এরপর ফিরে যেতে হয় ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়ে। ২৫ ও ২৬ মার্চের কালরাতের পর ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া নিজ কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার পর তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। পরে ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করে। এরপর সামরিক আইন ও জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে তিনি দেশকে ফিরিয়ে আনেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারায়। একজন সেনানায়ক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

মাত্র কয়েক বছরের শাসনকালেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। দল ও ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী বাংলাদেশের। তাঁর জীবন ছিল দুর্বার, কর্মমুখর ও গতিশীল।

১৯৮১ সালের ২৯ মে দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের হৃদয়ে নিজের স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনগণের আপনজন। তাই তাঁর মৃত্যুর পর একটি কফিনের নিচে সমবেত হয়েছিল সারা বাংলাদেশের মানুষ। ঢাকায় তাঁর কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিল লাখো শোকাহত জনতা। চট্টগ্রামের লালদীঘি, আউটার স্টেডিয়াম ও সার্কিট হাউস এলাকাজুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। সমগ্র বাংলাদেশ যেন পরিণত হয়েছিল এক শোকের নগরীতে। এমন এক সময় তাঁকে হারাতে হয়েছিল, যখন দেশ ও জাতির জন্য তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আজও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত রয়েছে তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ। আমাদের চেতনা, প্রত্যাশা ও বিশ্বাসের গভীরে তিনি আছেন এক অনির্বাণ শিখা হয়ে।

বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে জাতির হৃদয়মর্মিত শোকের এই দিনটি। শোককে শক্তিতে পরিণত করার পথনির্দেশ দিয়ে আবারও আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন শহীদ জিয়া। মৃত্যুহীন জীবনের সেই বাণী তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল– ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লবের সেতু হয়ে।’ আজকের এই মুহূর্তে আমরা অনুভব করছি ইতিহাসের মহানায়ক জিয়ার অপরাজেয় সত্তাকে। জাতির মহান এই আদর্শের নাম জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে এই আদর্শ। অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলছে তার মশাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিস্টেম উন্নয়নই হোক দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার