(দুই ও শেষ পর্ব)
(কবি–পরিচালকদের জীবন ও সৃজনশীলতা)
জঁ ককতো: অর্ফিক ত্রয়ী ও কবির আত্মজৈবনিক সিনেমা
ফরাসি শিল্পী জঁ ককতো (১৮৮৯– ১৯৬৩) নিজেকে প্রথমত একজন কবি হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন, যদিও তিনি উপন্যাস, নাটক, চিত্রকর্ম এবং চলচ্চিত্রেও সমান দক্ষ ছিলেন । তার মতে, শিল্পের প্রতিটি রূপই আসলে কবিতারই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ–যাকে তিনি বলতেন ‘সিনেম্যাটিক পোয়েট্রি’ (poesie cinematographique)। ককতো তার বিখ্যাত ‘অরফিক ট্রিলজি’র মাধ্যমে একজন কবির যন্ত্রণাময় সৃষ্টিপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যু ও পুনর্জন্মের রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন ।
ককতোর চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক ও রূপক কাঠামোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো তার তিনটি ছবি: Le sang d’un poete (১৯৩০), Orphee (১৯৫০) এবং Le Testament d’Orphee (১৯৬০) । Le sung d’un poete ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন কবির রক্ত ও আত্মার বিনিময়ে কিভাবে শিল্পের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে Orpheeছবিতে তিনি আয়নার মাধ্যমে মৃত্যু ও পরলোকের যাত্রাকে চিত্রায়িত করেছেন এবং Le Testament d’Orphee ছিল কবির শেষ দলিল যেখানে তিনি নিজের শিল্পের সাথে স্রষ্টার সাক্ষাৎকারের কথা বলেছেন ।
ককতোর কাছে সিনেমা ছিল একটি দর্পণ বা আয়না, যা দিয়ে মানুষের অবচেতন মনের গভীর রহস্যগুলো দেখা যায় । তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিল্প হলো অবচেতন এবং সচেতনের এক মিলনমেলা এবং পরিচালকের কাজ হলো দর্শককে সম্মোহিত করে স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমানায় নিয়ে যাওয়া । ককতোর এই সৃষ্টিশীল যাত্রা প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র যখন কবিতার হাত ধরে, তখন তা কেবল একটি দৃশ্যমাধ্যম থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মার এক অনন্ত যাত্রা ।
গুলজার: হিন্দুস্থানি লিরিসিজম ও প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দ
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং গভীর সংবেদনশীল পরিচালক ও কবি হলেন গুলজার (জন্ম ১৯৩৪) । গুলজারের সৃজনশীলতা মূলত তাঁর কলমের ডগায়–সেটা চলচ্চিত্রের সংলাপ হোক, গানের কথা হোক কিংবা স্বতন্ত্র কবিতা । তার ভাষা ‘হিন্দুস্তানি’, যা হিন্দি এবং উর্দুর এক চমৎকার সংমিশ্রণ, যেখানে প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ শব্দগুলোও অসাধারণ কাব্যিক মহিমা লাভ করে। গুলজারের কাছে কবিতা হলো তার জীবনের আসল বিবৃতি (statement), আর চলচ্চিত্রের কাজ হলো পেশাগত দায়বদ্ধতা।
গুলজারের সৃজনশীল যাত্রার প্রধান স্তম্ভগুলো তার প্রকাশিত কবিতা সংকলন এবং চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা সংকলনগুলো হলো Raat Pashminey কর, Pandrah Paanch Pachattar এবং Chand Pukhraaj ka। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে Mere Apna, Koshish Aandhi Mausam Ges ijaazat বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গুলজারের চলচ্চিত্রে কবিতার প্রভাব বহুমুখী–তিনি তাঁর ছবিতে প্রায়শই নদী, চাঁদ, বৃষ্টি এবং একাকীত্বের স্পর্শকাতর চিত্রায়ন করেন ।
গুলজারের কবিতায় চাঁদ প্রায়শই একটি দুঃখের প্রতীক হিসেবে আসে, কখনও তা ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ের তালি, আবার কখনও তা ভিক্ষার পাত্র । তার চলচ্চিত্রে চরিত্রগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং একাকীত্ব কবিতার ছন্দের মতোই ধীরস্থিরভাবে দর্শকদের হৃদয়ে প্রবেশ করে। গুলজারের কাছে শিল্প হলো এক ধরনের আত্মসমর্পণ, যেখানে শিল্পী নিজেকে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে সত্যের সন্ধান করেন । তাঁর চিত্রনাট্যে নন–লিনিয়ার ন্যারেটিভ এবং ফ্ল্যাশবব্যাকের সুনিপুণ ব্যবহার কাব্যিক সংবেদনশীলতারই ফল।
শুজি তেরায়ামা: জাপানি তঙ্কা ও পরাবাস্তববাদী মন্টাজ
জাপানি আভাগার্দ (avant-garde) ধারার পরিচালক শুজি তেরায়ামা (১৯৩৫–১৯৮৩) ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার এবং আলোকচিত্রী । তেরায়ামা তাঁর শৈল্পিক জীবন শুরু করেছিলেন ‘তঙ্কা’ (tanka) নামক ৩১–মাত্রার জাপানি ঐতিহ্যবাহী কবিতার মাধ্যমে। তেরায়ামার তঙ্কা কবিতাগুলো কেবল শব্দগুচ্ছ ছিল না, বরং সেগুলো ছিল একেকটি দৃশ্য বা ‘সিনেমাটিক ইমেজ’ । তেরায়ামার চলচ্চিত্রে কবিতার প্রভাব তার মন্টাজ বা সম্পাদনার কৌশলে বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
তেরায়া মার সবচেয়ে পরিচিত চলচ্চিত্র Pastoral: To Die in the Country(১৯৭৪) মূলত তাঁর একটি তঙ্কা সংকলনেরই চিত্ররূপ, যেখানে তিনি নিজের শৈশবের স্মৃতিকে কবিতার মতো খণ্ডিত এবং রূপকধর্মী হিসেবে পুনর্গঠন করেছেন । তিনি তঙ্কা কবিতার ‘রেনসাকু’ (Rensaku) বা পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিকতাকে সিনেমার মন্টাজ হিসেবে ব্যবহার করতেন । তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ যেমন Emperor Tomato Ketchup এবং Grass Labyrinthছবিতে ঘড়ি, ছাগল এবং প্রজাপতির মতো প্রতীকী জগতের ব্যবহার দেখা যায় যা তার কবিতার সাথে সরাসরি যুক্ত।
তেরায়ামা মনে করতেন, সিনেমা কেবল বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বরং তা বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার । তার কাছে কবিতা এবং সিনেমা–উভয়ই ছিল এক ধরনের ‘কল্পনার স্বাধীনতা’, যা মানুষকে সামাজিক ও মানসিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয় । তার কাজগুলোতে সোভিয়েত চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক পুডোভকিনের মন্টাজ তত্ত্বের সাথে জাপানি তঙ্কা কবিতার ছন্দের এক অনন্য সংশ্লেষণ লক্ষ্য করা যায় ।
উপসংহার: একটি অখণ্ড শিল্পসত্তার সন্ধানে
সিনেমার ইতিহাস কেবল প্রযুক্তির বিবর্তন নয়, বরং এটি মানুষের প্রকাশের আকুলতার ইতিহাস। পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, জঁ ককতো এবং গুলজারের মতো শিল্পীরা প্রমাণ করেছেন যে, একজন প্রকৃত স্রষ্টার কাছে মাধ্যমের বিভাজন গৌণ। তাদের জীবনে কবিতা ছিল সেই আদি উৎস, যেখান থেকে সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম প্রাণশক্তি আহরণ করেছে। কবিতা তাদের শিখিয়েছে কিভাবে সত্যকে সরাসরি না বলে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয়, কিভাবে নিস্তব্ধতার মধ্যে শব্দ খুঁজে পেতে হয় এবং কিভাবে প্রাত্যহিক জীবনের ধুলোবালির মধ্যে আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ পেতে হয় ।
তাদের উত্তরাধিকার আমাদের এটাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সিনেমা যখন কবিতার হাত ধরে, তখন তা কেবল একটি দৃশ্যমাধ্যম থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মার এক অনন্ত যাত্রা। আধুনিক ডিজিটাল যুগেও এই কাব্যিক চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি, বরং তা আরও গভীরতর হয়েছে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জীবন ও শিল্পের মানে খুঁজি, তখন এই কবি–পরিচালকদের কাজ আমাদের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। তাদের সৃষ্টি আমাদের শেখায় যে, সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখার বস্তু নয়, বরং তা অনুভব করার এক আধ্যাত্মিক সাধনা।













