বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে যেন একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। যান চলাচল অচল হয়ে পড়ে, অফিসগামী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা–বাণিজ্য, এমনকি জরুরি চিকিৎসাসেবাও অনেক সময় বিঘ্নিত হয়। এরপর শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, সমালোচনা, ছবি, ভিডিও আর নানা ধরনের ব্যঙ্গ–বিদ্রুপ।
এই ক্ষোভের বড় একটি অংশ অবশ্যই যৌক্তিক কেননা বছরের পর বছর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অসমাপ্ত অবকাঠামো প্রকল্প, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, খাল দখল, এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ– এসবই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য মূলত দায়ী। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতা অপরিহার্য এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
তবে এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কি কেবলই প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল? নাকি এটি নাগরিক দায়িত্ববোধের সংকটও?
আমরা প্রায়ই সরকারের কাছে পরিচ্ছন্ন শহর, সচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি জানাই। কিন্তু একটি শহর তখনই সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন রাষ্ট্র ও নাগরিক– উভয়েই নিজেদের দায়িত্ব পালন করে।
আমাদের দৈনন্দিন আচরণের দিকেই যদি আমরা তাকাই তাহলে হর হামেশাই দেখতে পাই অনেকেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল কিংবা প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার শেষে অনেকেই বিনা দ্বিধায় ড্রেনে ফেলে দেন। নিয়মিত সিটি কর্পোরেশনের ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেও কিছু মানুষ এখনো খাল, নালা কিংবা উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলেন শুধু সুবিধার কথা ভেবে। আলাদাভাবে দেখলে এসব কাজ তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু হাজারো মানুষের একই অভ্যাসই একসময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ড্রেনে জমে থাকা প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালির বর্জ্য বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে, রাস্তাঘাট নদীতে পরিণত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় এই সমস্যার জন্য যাঁরা নিজেরাও পরোক্ষভাবে দায়ী, তাঁরাই আবার সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে সরকারের দায় কমে যায়। বরং সরকারকে আরও কার্যকরভাবে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে বাস্তবতা হলো, নাগরিকরা যদি প্রতিদিন ড্রেনকে ময়লার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে কোনো ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
বিশ্বের অনেক শহর নগর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সফল হয়েছে শুধু উন্নত অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নয়, বরং নাগরিকদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। সেখানে মানুষ জানে, রাস্তায় ময়লা ফেলা শুধু অপরিচ্ছন্নতার পরিচয় নয়; এটি জননিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলে।
বাংলাদেশেও সেই মানসিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতার চর্চা বাড়াতে হবে। বর্জ্য আলাদা করা, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা এবং জনপরিসরের প্রতি সম্মান দেখানো–এসব অভ্যাসকে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করা অত্যন্ত জরুরি।
সমস্ত আলোচনায় আরেকটি বিষয়ও প্রাসঙ্গিক। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্যার মতো ভেসে আসে হাস্যরসাত্মক ভিডিও ও নানা ধরনের মিমস। কঠিন বাস্তবতায় হাস্যরস মানুষকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু একটি প্রতিরোধযোগ্য নগর সমস্যাকে স্বাভাবিক কিংবা বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। বরং প্রতিটি জলাবদ্ধতার ঘটনা আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ হওয়া উচিত। তাই প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়–সরকার কোথায় ব্যর্থ হয়েছে? প্রশ্ন হওয়া উচিত–আমরা নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কতটা পালন করেছি?
একটি পরিচ্ছন্ন শহর শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একার পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিদিন যদি অসচেতনভাবে ড্রেনে বর্জ্য ফেলা হয়, তাহলে কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে না। নাগরিক দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশে নয়; বরং বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই নিজের আচরণে পরিবর্তন আনার মধ্যেই তার প্রকৃত প্রকাশ।
চট্টগ্রাম অবশ্যই আরও ভালো নগর পরিকল্পনা ও কার্যকর অবকাঠামো পাওয়ার যোগ্য। তবে একই সঙ্গে এই শহর আরও দায়িত্বশীল নাগরিকও প্রাপ্য।
জলাবদ্ধতা শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়। সরকারকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে, আর নাগরিকদের সেই অবকাঠামো রক্ষা করতে হবে সচেতন আচরণের মাধ্যমে। এক পক্ষের দায়িত্ব পালনে অন্য পক্ষের ব্যর্থতা ঢেকে যায় না।
স্কুল থেকেই যদি এসব নিয়ম অভ্যাসে পরিণত করা যায় তাহলে একজজ শিশু সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সেজন্য প্রয়োজন সরকারি–বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগ। এছাড়া রাস্তা, ড্রেনে ময়লা ফেললে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করাও জরুরি।
পুনশ্চঃ আমরা যদি প্রতিবার বর্ষায় শুধু সরকারের দিকে আঙুল তুলি, অথচ নিজের ছোট ছোট ভুলগুলোকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার গল্প আগামী বছরও একই থাকবে। এই শহরের ভবিষ্যৎ শুধু বড় ড্রেন বা নতুন সড়কের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে আমাদের নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ওপরও।
সুতরাং যখন বৃষ্টি নামবে, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ নয়– আশা করি আমরা প্রত্যেকে নিজের দায়িত্বটুকুও পালন করব। কারণ শহরকে বদলানোর শুরুটা আমাদের নিজেদের থেকেই।
লেখক : প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ,
বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।












