পেকুয়া উপজেলায় মাতামুহুরী নদী ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে অবৈধভাবে মাছ ধরার ফাঁদ (নাসি) স্থাপন করায় বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পাউবোর ৫৪টি স্লুইচ গেটের মধ্যে সচল ৫১টির অধিকাংশই প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকায় পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে নৈরাজ্য ও ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মগনামা, রাজাখালী, উজানটিয়া, পেকুয়া সদর ও টইটং ইউনিয়নে শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহে কৃষকদের স্লুইচ গেটকেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পানি প্রবেশ করাতে নগদ অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে মাছের ঘের পরিচালনা, ধান ও সবজি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানি প্রবাহ এবং অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও কৃষকরা নিয়মিত প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনভোগান্তিও বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, মাছ ধরার অবৈধ নাসি বসাতে বেড়িবাঁধ কেটে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। ফলে বর্ষা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এসব স্থান দিয়ে নদী ও সাগরের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে। এছাড়া অবৈধভাবে পানি আটকে রাখার কারণে অনেক গ্রামীণ সড়ক ও চলাচলের পথও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে পেকুয়া এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী জমির উদ্দিন বলেন, প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত থাকায় অবৈধ নাসি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। অভিযোগ পেলে আমাদের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি আরও জানান, পেকুয়ায় পাউবোর মোট ৫৪টি স্লুইচ গেটের মধ্যে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ৩টি ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে ৫১টি স্লুইচ গেট সচল থাকলেও মাত্র ৬টির ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। বাকি অধিকাংশ স্লুইচ গেটের কোনো বৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই।
এদিকে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গত ৭ জুলাই পেকুয়া উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা চিহ্নিতকরণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস এবং পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে সভা হলেও বেড়িবাঁধ কেটে অবৈধ নাসি স্থাপন এবং স্লুইচ গেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কার্যকর সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা উদ্যোগ নেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









