খেলাপি হওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণের টাকা ব্যাংকে ফেরাতে বড় ধরনের ছাড় ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহকদের মধ্যে যারা ঋণ খেলাপি রয়েছেন তারা মূল অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করলে সুদ দিতে হবে না তাদের। অর্থাৎ ঋণের বিপরীতে আগে তাদের যে নির্দিষ্ট হারে সুদ গুনতে হতো, সেটি আর পরিশোধ করতে হবে না। এ সুবিধা পেতে হলে ঋণ গ্রহীতাদেরকে তাদের খেলাপি ঋণের অর্থ আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার গত সোমবার জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খবর বিডিনিউজের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর আগের প্রান্তিক ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকার ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
সাধারণত খেলাপি, অবলোপন করা এবং পুনঃতফসিল করা ঋণকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘অনাদায়ী ঋণ আদায়/সমন্বয়ে বিশেষ এঙিট সংক্রান্ত নীতিমালা’ শীর্ষক এ সার্কুলারে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বিরূপভাবে প্রভাবিত হওয়ায় ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানো অত্যাবশ্যক।
এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে পতিত হলেও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের এককালীন বিশেষ এঙিট সুবিধা প্রদান করা হলে একদিকে যেমন ব্যাংকসমূহের খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যাংকার–গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ এঙিট প্রদান করা যাবে। এ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নিচের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে :
বিশেষ এঙিট সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাকে সমুদয় দায় এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাদের সব আরোপিত ও অনারোপিত উভয় ধরনের সুদ মওকুফ করা যাবে। এর ফলে সুদ মওকুফের আগে তহবিল খরচ আদায় নিশ্চিত করার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা শিথিল করা হল। মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ, যা ৬ অগাস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সময়ে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেই ঋণও বিশেষ এঙিট সুবিধা পাবে। বিশেষ এঙিট প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষি খাতের স্বল্প মেয়াদী কৃষি ঋণ ও সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও স্মল ঋণকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং ও নীতি বিভাগ সার্কুলারটি জারি করেছে। এ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বুধবার সন্ধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে বিশেষ এ সুবিধা দেওয়ার ফলে সরকারি–বেসরকারি সব ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ আদায় করতে সক্ষম হবে। পরে সেই অর্থ পুনরায় ঋণ আকারে নতুন গ্রাহকদের দেওয়া হবে, যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে।











