খাতুনগঞ্জে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের বিক্ষোভ, তালা

স্বাভাবিক লেনদেন চালু ও লভ্যাং'শ কর্তন পদ্ধতি বাতিলের দাবি

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ৪ মে, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

পুরো মুনাফাসহ আমানত ফিরে পাওয়ার দাবিতে নগরীর খাতুনগঞ্জে বিক্ষোভ করেছেন একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী ও গ্রাহকরা। গতকাল রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমানতকারীরা স্বাভাবিক লেনদেন চালু ও লভ্যাংশ কর্তন বা ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের সামনে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

বিক্ষুব্ধ গ্রাহক ও আমানতকারীরা প্রথমে ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় প্রবেশ করে জমানো অর্থ ফেরতের দাবিতে অবস্থান নেন। পরে তারা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শাখার সামনে গিয়ে একই দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ গ্রাহক ও আমানতকারীরা ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ব্যাংকের তালা খুলে দেয়। বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের দাবি, মুনাফার আশায় তারা ব্যাংকে টাকা রাখলেও এখন আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। এ কারণে পরিবার নিয়ে তারা সংকটে রয়েছেন। তবে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতনবোনাসসহ সকল সুযোগসুবিধা ঠিক আছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা ‘হেয়ারকাট’ প্রস্তাব বাতিল, স্বাভাবিক লেনদেন চালু ও জমানো অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন; কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। তাদের দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন শাখায় ঘুরেও তারা নিজেদের জমানো অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না; বরং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আবদুল আলিম নামে একজন গ্রাহক জানান, তার অ্যাকাউন্টে কোটি টাকার বেশি জমা থাকলেও প্রয়োজনের সময় সামান্য অর্থও তুলতে পারছেন না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি বলে তার অভিযোগ। আরেকজন আমানতকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিরাপত্তার আশায় ব্যাংকে টাকা রেখেছিলাম। এখন সেই টাকা তুলতেই পারছি না। ব্যাংকে টাকা রাখা যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত এক চাকরিজীবী বলেন, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতনবোনাস চলছে। কিন্তু আমরা আমাদের টাকা চাইলে তারা দিতে পারে না। শুধু সময় চাইছে আর হেয়ারকাটের কথা বলছে। আমরা প্রতিদিন এসে ঘুরে যাচ্ছি। আমানতকারীদের টাকা নিয়ে তারা এমন টালবাহানা করছে। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই। আমরা নিজেদের টাকা চাইছি, অন্য কারো টাকা চাইছি না।

মো. তানভীর নামে এক আন্দোলনকারী বলেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা থাকার পরও সেগুলো তারা তুলতে পারছেন না। স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারছেন না। ইউনিয়ন ব্যাংক ও এঙ্মি ব্যাংকে আমানত রেখেছিলাম। সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে এফডিআর থেকে মুনাফা তুলেছি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ২০২৪২০২৫ সালের ৪ শতাংশ মুনাফা বাদে বাকি টাকা মূলধন থেকে কেটে রাখা হবে। পাশাপাশি যেসব এফডিআর মেয়াদ পূরণ হয়নি সেগুলোও ভাঙতে দেওয়া হচ্ছে না।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী শারমিন আক্তার বলেন, ২০১৮ সালে ব্যাংকে টাকা রেখেছি। এখন বলা হচ্ছে ২০২৪২০২৫ সালের মুনাফার ৪ শতাংশ বাদে বাকি টাকা আমাদের আসল থেকে কেটে রাখা হবে। আমরা টাকা উত্তোলন করতে চাইলেও সেটা করতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে বলছে ২০২৮ সালের আগে টাকা উত্তোলন করা যাবে না। সে সময় আমরা যে টাকা উত্তোলন করতে পারব তার নিশ্চয়তাও কেউ দিচ্ছেন না।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক কে এম আবু সাঈদ বলেন, সাধারণ ব্যাংকার হিসেবে এ নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে তিনি আমানতকারীদের দাবিগুলো শুনেছেন এবং সেগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সম্মিলিত ব্যাংকের এ কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি।

আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আজম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, লভ্যাংশ কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি গ্রাহকদের জন্য অন্যায্য। তিনি জানান, লভ্যাংশ কর্তনের পরও গ্রাহকরা তাদের আমানত তুলতে পারছেন না। এ সিদ্ধান্ত বাতিল ও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার দাবিতেই গ্রাহকরা আন্দোলনে নেমেছেন।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, ব্যাংকগুলোয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। বিক্ষোভের কারণে ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হয়নি। এছাড়া আর্থিক লেনদেন সচল রাখতে পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং পুলিশ আন্দোলনকারীদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৪ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতে ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এতে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতে ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএনজিও কর্মকর্তার ৫ বছরের কারাদণ্ড
পরবর্তী নিবন্ধএক প্রকল্পে ঘুচবে লাখো মানুষের দুর্ভোগ