আবুবকর সিদ্দিকের খরাদাহ উপন্যাসে উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপীড়িত প্রান্তিক মানুষের জীবন উঠে এসেছে। তবে এখানে প্রকৃতির প্রতিকূলতাই মানুষের দুর্দশার একমাত্র কারণ নয়। দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্য ও যৌনশোষণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনা দেখায়, প্রকৃতির রুক্ষতা ও অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা মানুষের ওপর সম্পদশালী ও ক্ষমতাবানদের আধিপত্য কীভাবে শোষণের নতুন মাত্রা যোগ করে।
উপন্যাসটির রচনাকাল ১৩ জুন ১৯৭৯ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৪। প্রথমে ১৯৮৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘রোববার’–এর ঈদসংখ্যায় ‘খরাযাত্রী’ নামে প্রকাশিত হয় এটি। পরে ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় ‘খরাদাহ’ নামে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসের পটভূমি উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল, স্থানীয় ভাষায় ‘বরীন’। রুক্ষ মাটি, অনাবৃষ্টি ও তীব্র গরমের মধ্যে সেখানকার মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে ওঠে। কাহিনির শুরুতে ঘটক নাটুমিয়া, পাত্রের বাবা বাহাউদ্দিন ও পাত্র দলিল মিয়াসহ কয়েকজন পালকি নিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া প্রান্তর পেরিয়ে চলতে থাকে। শুরুতেই লেখক তীব্র তাপদাহ, পানির অভাব ও রুক্ষ মাটির মধ্যে বরযাত্রীদের দুর্ভোগ স্পষ্ট করেছেন। এর মাঝেই বিয়ের আয়োজন বড় বেমানান লাগে। লোকজ কথাবার্তা ও হাস্যরসের মধ্য দিয়ে লেখক এমন এক জনজীবন তুলে ধরেছেন, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অসঙ্গতি।
উপন্যাসে উল্লেখযোগ্য দুই শোষক মসিদ খাঁ ও বাহাউদ্দিন ব্যাপারী। এই চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সামাজিক প্রতিপত্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে অন্যের জীবন ও শরীরের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে। মসিদ খাঁ একজন ভূমিদস্যু। প্রান্তিক জনগণের মৌলিক চাহিদা, এমনকি পানির প্রাপ্যতাও তার নিয়ন্ত্রণে। এক কলসির বেশি পানি নিলে তার লাঠিয়াল সেই কলসি ভেঙে দেয়। তার প্রথম বিবির শৌচকার্যে যতখানি পানির প্রয়োজন, দাসীদের মতে সেই পানি দিয়ে পুরো গ্রামের পানির চাহিদা পূরণ সম্ভব। এটি কথার কথা হলেও বোঝা যায় যে, প্রাকৃতিক খরার পাশাপাশি উচ্চবর্গের সৃষ্ট খরাও নিম্নবর্গের মানুষের তীব্র ভোগান্তির জন্য দায়ী। চারিত্রিক দিক থেকেও সে লম্পট! একাধিক বিবি থাকা সত্ত্বেও মসিদ খাঁ দাসীদের সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়। যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও তার ভোগলিপ্সা কমে না। তার ছেলে আরশাদও পাত্রী চিকনদাসীকে গর্ভবতী করে দরিদ্র পরিবারটির ওপর নতুন সংকট তৈরি করে।
অন্যদিকে, পুঁজিবাদী সমাজের শোষক বাহাউদ্দিন বেপারী তার কথিত পুত্র দলিলকে নিয়ে বিয়ের নামে প্রহসন সাজিয়ে চিকনদাসীকে তুলে নিতে চায়। এই বিয়ে থেকে বাঁচতে চিকনদাসী ছুটে যায় লম্পট আরশাদের কাছেই। চিকনদাসী ও আরশাদের কথোপকথনে নারীর প্রতি সুবিধাপ্রাপ্ত পুরুষদের অধিকারবোধ ও যৌনলিপ্সা প্রকাশিত হয়।
বাহাউদ্দিন যখন পুত্র দলিলের সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর প্রতি কুনজর দেয়, তখন ঘটনাটি পাঠকের মনে খটকা তৈরি করে। পরবর্তীকালে এর কারণও উন্মোচিত হয়। বাহাউদ্দিন মূলত নিম্নবর্গের নারীদের তুলে নিয়ে পতিতালয়ে বিক্রি করে।
চিকনদাসী ও তার মা তরুদাসীর জীবনের একটি ঘটনা দারিদ্র্যের নির্মমতাকে আরও স্পষ্ট করে। আত্মহত্যার চেষ্টা করার সময় চিকনদাসী যে শাড়িটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল, সেই শাড়িই পরে থাকতে হয় তার মা তরুদাসীকে।
ভল্লার সঙ্গে চিকনদাসীর একটি কথোপকথনে বোঝা যায়, একটু স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা কতটা তীব্র হতে পারে।
‘হামাক ই খরার লরক থাক্যা লিয়্যা যাবি ভলল্যা?
লিব্যো।
কুনঠে সি? পানির দ্যাশে?
লিব্যো।
আঃ! ভাতের দ্যাশে?
লিব্যো।
আঃ! গাছের দ্যাশে?
লিব্যো।
আঃ! হায় গ! মানহুশের দ্যাশে লিব্যি?
লিব্যো।’
তবে উপন্যাসে নিপীড়িত মানুষের জীবন শুধু অসহায়ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভল্লার নেতৃত্বে শোষিতরা একসময় বিদ্রোহ করে।
আবুবকর সিদ্দিকের ভাষার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আঞ্চলিক কথ্যভাষা ও লোকজ প্রকাশভঙ্গির ব্যবহার। সংলাপে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার আছে, কিন্তু এর ব্যবহার এতটাই স্বাভাবিক যে কটু লাগে না। প্রায় চল্লিশ বছর আগের এই উপন্যাসে উচ্চবর্গের নারীর সমকামিতার প্রসঙ্গও লেখক এনেছেন। অর্থাৎ, লেখক উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়েও মানুষের নানা দুর্বলতা ও প্রবৃত্তি প্রকাশ করেছেন। উপন্যাসে কিসমত মিয়ার স্মৃতির মাধ্যমে তেভাগা আন্দোলন এবং রাজবংশী সাঁওতালদের শোষণের প্রসঙ্গও এসেছে।
দক্ষিণবঙ্গে বেড়ে ওঠা এই আমার উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ ও কথ্যভাষার অত্যধিক ব্যবহারের কারণে উপন্যাসটি পড়তে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়া প্রথম মুদ্রনের বই, তখনকার ব্যবহৃত ফন্টের সাথে পরিচয় কম বিধায় কিছুটা সমস্যা হলেও অনুভূতিটা অন্যরকম।
সবশেষে, খরাপীড়িত অঞ্চলের শোষক ও শোষিতের অবস্থা বুঝতে খরাদাহ উপন্যাসটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যদিও উপন্যাসটির ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবুও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
আমার সংগ্রহের বইটি ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রণের কপি। উপন্যাসটির কিছু খামতি থাকলেও বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বিবেচনায় এর পুনর্মুদ্রণ জরুরি।










