সময়টি ২০২২ সালের ১৭ জুলাই। সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে লুডু খেলার সময় মো. হাসান প্রকাশ সোনাইয়া (৩৬) কৌশলে ভিকটিম মো. বেলালকে (১৩) সাঙ্গু কলেজ মাঠে আড়াষ্যা (লম্বা পানি) নামক স্থানে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে তাকে জিম্মি করা হয় এবং তার কাছ থেকে ইয়াবা ও টাকা দাবি করা হয়। পরে তাকে পাশের লম্বাপানি নামক ব্রিজে নিয়ে কয়েকজন মিলে হাত–পা চেপে ধরে রাখে এবং তার পকেট থেকে টাকা ও মোবাইল নিয়ে নেয়। তখন বেলাল প্রাণভিক্ষা চাইলেও প্রধান আসামি হাসান কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কিশোর বেলালের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পরিচয় গোপনের জন্য চুল কেটে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে লাশ ও মাথা মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং রক্তের দাগ মুছে ফেলা হয়।
এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিল বেলাল। ১৮ দিন পর ধরে নিখোঁজ থাকার পর কিশোর বেলালের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২২ সালের ৪ আগস্ট বিকালে পুরানগড়ের একটি পাহাড়ি টিলায় মাটি চাপা দেয়া অবস্থা থেকে শিয়াল মাটি থেকে বেলালের লাশ টেনে বের করলে চারদিকে পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে যায়। পোশাক দেখে বেলালের পরিবার বেলালকে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় মুন্সী মিয়া মামলা করেন এবং পরে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর সিআইডির তদন্তে এই লৌমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। সিআইডির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূলত ইয়াবা ব্যবসার লভ্যাংশ নিয়ে বিরোধের জেরে বন্ধু মো. পারভেজের পরিকল্পনায় খুন হয় কিশোর বেলাল। পরে লাশ গুম করে ফেলা হলেও তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ সেই হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র।
চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মোশারফ হোছাইন জানান, বেলাল স্থানীয় অটোরিকশাচালক মো. পারভেজের গাড়িতে নিয়মিত চলাফেরা করতেন। পারভেজের মাধ্যমেই তিনি ইয়াবা আনা–নেওয়ার কাজ করতেন। এই কাজের জন্য পারভেজকে দ্বিগুণ ভাড়াও দিতেন বেলাল। একপর্যায়ে মাদক ব্যবসার লাভের অর্ধেক দাবি করেন পারভেজ। এতে বেলাল অস্বীকৃতি জানালে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পারভেজ। ইয়াবা বিক্রির লাভের অংশ না পেয়ে পরে পারভেজ ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসী হাসান প্রকাশ সোনাইয়ার মিলে বেলালকে হত্যার পরিকল্পনা করে। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্তভার গ্রহণ করে।
নিহত বেলাল কার সঙ্গে চলাফেরা করতেন তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে একাধিকবার সাতকানিয়া এলাকায় যাওয়ার পর অটোরিকশাচালক পারভেজের সন্ধান পাওয়া যায়। পারভেজের অটোরিকশায় করেই বেলাল চলাফেরা করতেন। পরবর্তীতে সন্দেহভাজন হিসেবে গত ৭ মে রাত সাড়ে ১০টায় সাতকানিয়ার বাজালিয়া বাজার থেকে পারভেজকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। গত ৮ মে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পারভেজের ভাষ্যমতে, ইয়াবা বিক্রির লাভের অংশ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করে কিশোর বেলালকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। এর মাধ্যমে এতদিন অন্ধকারে থাকা এই মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়। ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বেলাল হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার পারভেজ এজাহারভুক্ত আসামি নয়। ইয়াবার পরিবহন করা গাড়ির চালক পারভেজকে সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। আটক করার পরে রিমান্ড ছাড়া হত্যার বিস্তারিত তথ্য আমাদের কাছে স্বীকার করেন। এজাহারনামীয় ছয় আসামি জামিনে আছেন।














