রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে সয়লাব টেকনাফের খাল-বিল

ব্যাহত লবণ, ধান ও মাছ চাষ

কক্সবাজার প্রতিনিধি | মঙ্গলবার , ১২ মে, ২০২৬ at ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের জনবহুল এলাকা হ্নীলা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিষাক্ত বর্জ্যে সয়লাব হয়ে গেছে এই লোকালয়। পাঁচটি ক্যাম্পের ১ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পয়ঃবর্জ্যসহ নানা বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে বিষিয়ে উঠেছে এখানকার খালবিল। এ কারণে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানান, হ্নীলা ইউনিয়নের মাত্র চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় পাঁচটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই ক্যাম্পের ভেতরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক ও পচা আবর্জনা খাল হয়ে সরাসরি নাফ নদে গিয়ে মিশছে।

দেখা গেছে, হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী খাল, মুচনী ছুরি খাল, জাদীমুরা জাদীর খাল ও ওমর খালের পানি ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়েছে বহু আগেই। ক্যাম্পের তরল বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য মিশে খালের পানির রঙ কালো হয়ে গেছে। এর উৎকট গন্ধে খালের পাড় দিয়ে হাঁটাচলা করা যায় না।

লেদা এলাকার কৃষক আবদুল কাদের ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, পচা পানি ও বিষাক্ত বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে খাল ও বিলে। এমনকি লবণ মাঠেও। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ধান ও লবণ উৎপাদন হচ্ছে না। লোনা পানির বদলে এখন খালে শুধু রোহিঙ্গাদের ময়লা পানি আসে। ফলে চাষিদের প্রতিবছর ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। আরেক বাসিন্দা শহীদুল আলম বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আসা দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত পানি এখন খালবিল ছাপিয়ে নাফ নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই ময়লা পানির কারণে খালের পানি ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়েছে। কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। এভাবে দূষণ চলতে থাকলে খালগুলো চিরতরে মরে যাবে এবং কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

হ্নীলার জেলে নুরুল আলম বলেন, এক সময় খালবিল আর নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন বিষাক্ত পানির কারণে মাছ পাওয়া যায় না। তার ওপর বৃষ্টির সময় এই নোংরা পানি উপচে আমাদের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে।

ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের এই পাঁচটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাত্র একটি ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্লান্ট রয়েছে। ২৭ নম্বর ক্যাম্প এলাকা জাদীমুরায় ওই ট্রিটমেন্ট প্লান্টটির অবস্থান। ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি ওই ক্যাম্পের জন্যও অপ্রতুল। অথচ বাকি চারটি ক্যাম্পের কোনোটিতেই ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নেই। রোহিঙ্গাদের সৃষ্ট গৃহস্থালি বর্জ্যের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৭০ শতাংশ বর্জ্য, বিশেষ করে টয়লেটের তরল বর্জ্য সরাসরি পার্শ্ববর্তী খাল ও নদীতে যাচ্ছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমেও এখানকার খালের পানির রং স্বাভাবিক থাকে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, খালগুলোর পানির গুণাগুণ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এই পানি কোনোভাবেই ফসল উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য নয়। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।

টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান বলেন, অল্প জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি ক্যাম্পে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা না গেলে এই দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করছি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা হবে
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা