বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বৃহৎ শিল্পকারখানার পরিত্যক্ত জমি আজ দেশের অন্যতম সফল রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল। যে জায়গায় একসময় উৎপাদনের চাকা থেমে গিয়েছিল, দুই দশকে সেখানে গড়ে উঠেছে শিল্পের নতুন ঠিকানা। আর সেই ঠিকানা থেকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য পাড়ি দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ২০৯.০৪ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কর্ণফুলী ইপিজেড ইতোমধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। আজ শনিবার সকালে কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের রূপান্তর ও বিকাশ নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করা হবে। এতে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জায়গায় গড়ে ওঠা কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (কর্ণফুলী ইপিজেড) দুই দশকের যাত্রার বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
বেপজা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের শিল্পায়নের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সাক্ষী কর্ণফুলী ইপিজেড। বন্ধ ঘোষিত চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জায়গাকে শিল্পায়নের নতুন ঠিকানায় রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্ণফুলী ইপিজেড উদ্বোধন করেন। এরপর গত দুই দশকে ইপিজেডটি বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আজকের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস থেকে কর্ণফুলী ইপিজেডে রূপান্তরের ইতিহাস, দুই দশকের পথচলা ও অর্জন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রম, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ শিল্পাঞ্চলের অবদান তুলে ধরা হবে।
বেপজা সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম স্টিল মিলের জায়গায় নতুন করে শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০০৪ সালে স্টিল মিলের জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বেপজার কাছে হস্তান্তরের পর শুরু হয় নতুন শিল্পযাত্রা। সেই যাত্রা এখন দুই দশক পেরিয়ে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান সাফল্যে পরিণত হয়েছে।
বেপজা জানায়, কর্ণফুলী ইপিজেডে বর্তমানে ২৫৮টি শিল্প প্লট রয়েছে। এসব প্লটের মধ্যে ৪৬টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে এবং ৩৯টি কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন চলছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজারের বেশি মানুষের। কর্মীদের অন্তত ৬০ শতাংশ নারী। নতুন নতুন শিল্প ইউনিট চালু হলে এই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার প্রত্যাশা করছে বেপজা।
কর্ণফুলী ইপিজেডে এ পর্যন্ত ৭৮৫.৮৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। বিপরীতে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ১১৩.৮২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকে উৎপাদন ও রপ্তানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এ শিল্পাঞ্চল ইতোমধ্যে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন, হংকং, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও কানাডার পাশাপাশি বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও রয়েছেন।
কর্ণফুলী ইপিজেড চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার কারখানাগুলো আমদানি করা কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্য সহজে রপ্তানি করার সুবিধা পাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন অফডক ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নৈকট্য। ফলে আন্তর্জাতিক শিপমেন্ট, লিড টাইম এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
এখানে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পোশাক, জ্যাকেট, তাঁবু, চামড়াজাত পণ্য, বাইসাইকেল ও এর এঙেসরিজ, আসবাবপত্র, জুতা ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী পণ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পণ্যের অবস্থানও শক্তিশালী হচ্ছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি শিল্পাঞ্চলের পুনর্জন্মের ইতিহাস। ষাটের দশকে পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম স্টিল মিল ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন পুরনো স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণে এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে সাগর উপকূলের এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নানা সংকটের পর ১৯৯৯ সালে স্থায়ীভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
একসময় যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠত, সেই জায়গায় পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে রপ্তানিমুখী শিল্পের নতুন অবকাঠামো। বেপজার হাতে জমি হস্তান্তরের পর পর্যায়ক্রমে প্লট উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বদলে যেতে থাকে পুরো এলাকা। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর সেই পরিবর্তন আরো ত্বরান্বিত হয়েছে।
বেপজা জানায়, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কর্ণফুলী ইপিজেডের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে আসা হাজার হাজার মানুষ এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য তৈরি হয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান। শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা যুক্ত হয়ে তৈরি করছে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পণ্য।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা ও কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে ইপিজেডের কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল সেন্টারটি বর্তমানে হাসপাতালে রূপ নিয়েছে। সেখানে ১৮ জন চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। শ্রমিকদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্যও রয়েছে বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগ।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, কর্ণফুলী ইপিজেড দেশের অনন্য একটি শিল্পজোনে পরিণত হয়েছে। মাত্র দুই দশকে এর বিকাশ দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইসাথে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও রাখছে অনন্য অবদান।
কর্ণফুলী ইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন নতুন শিল্প ইউনিট চালুর মাধ্যমে কর্ণফুলী ইপিজেডে শ্রমিকসংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার আশা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় আরো বাড়বে। কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে ৮০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, ৭৮৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়। একটি বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জায়গাকে উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্রে পরিণত করে কীভাবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সফল মডেল তৈরি করা যায়, কর্ণফুলী ইপিজেড তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সামনে নতুন শিল্প ইউনিট যুক্ত হলে এই রপ্তানিযাত্রা আরো গতি পাবে।












