একটি সমাজের সভ্যতা শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা অবকাঠামোর চাকচিক্যে মাপা যায় না। মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, শিশু–কিশোররা কতটা সুরক্ষিত এবং একজন মানুষ আরেকজন মানুষের প্রতি কতটা মানবিক এসব প্রশ্নের উত্তরেই আসলে একটি সমাজের নৈতিক অবস্থান প্রতিফলিত হয়।
সামপ্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাদের সেই জায়গাতেই গভীরভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একের পর এক নির্মম ঘটনা যেন প্রশ্ন তুলছে আমরা কোন সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে অপরাধের খবর আসে। কিছুক্ষণ আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ হয়, অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে। তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনোটিকে আড়াল করে দেয়। এই প্রবণতা ভয়ংকর। অপরাধের বিরুদ্ধে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা। বিশেষ করে শিশু–কিশোরদের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এসব জানার পাশাপাশি তার সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে সে ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা, উদ্বেগ, বন্ধুত্ব, অনলাইন অভিজ্ঞতা কিংবা কোনো অস্বস্তিকর ঘটনার কথা বাবা–মায়ের কাছে বলতে পারে।
শুধু ‘কঠোর নজরদারি’ দিয়ে সন্তানকে নিরাপদ রাখা যায় না; প্রয়োজন বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, সময় এবং সচেতনতা।
পরিবারকে হতে হবে নিরাপত্তার প্রথম আশ্রয় বর্তমান সময়ে শিশু–কিশোরদের জীবন শুধু ঘর, স্কুল ও খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বন্ধুত্ব এবং ডিজিটাল যোগাযোগ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া বেশি জরুরি।
একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও খেয়াল রাখতে হবে সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সে কোনো ভয় বা চাপের মধ্যে আছে কি না, কারও দ্বারা হুমকি বা হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না। এসব বিষয় অবহেলা করা উচিত নয়।
তবে সব দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্র–সবার সমন্বিত দায়িত্ব রয়েছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক বার্তা হলো আইনের নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ। অপরাধী যে–ই হোক, তার পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান যা–ই হোক, তদন্ত হতে হবে পেশাদারভাবে এবং বিচার হতে হবে আইন অনুযায়ী।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; তার প্রভাব একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং কখনো কখনো একটি প্রজন্মের ওপর পড়ে। তাই শুধু ‘অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের জানতে হবে কেন অপরাধ বাড়ছে, কোথায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল, কোথায় আইন প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে পরিবার ও সমাজের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো যায়।
আজ অপ্রতিমের পরিবার কাঁদছে। আগামীকাল এমন কোনো ঘটনা যেন আমাদের দরজায় এসে না দাঁড়ায় সেই দায়িত্ব আজ থেকেই নিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিশু–কিশোরদের প্রতি পারিবারিক নজর ও ভালোবাসা বাড়ানো এবং সামাজিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা এই পথেই আমাদের এগোতে হবে। নইলে একদিন হয়তো আমরা শুধু প্রশ্নই করে যাব এই নির্মমতার শেষ কোথায়?












