এআই যুগে মানবিক মূল্যবোধের ভবিষ্যৎ

শেখ বিবি কাউছার | সোমবার , ৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ

আজকের তরুণ প্রজন্মেও বেড়ে ওঠা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিমণ্ডলকে ঘিরে। তারা এখন প্রবেশ করছে ডিজিটাল যুগের ‘ডিজিটাল নেটিভ’দের ছাড়িয়ে ‘এআইনেটিভ’ সমাজে। এটি এমন এক সমাজ, যেখানে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কাজকর্ম এমনকি অনেকসময় আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার ক্ষেত্রে এআই এর সহায়তা নিচ্ছে। একটু পেছনের দিকে ফিরে যায়, যখন এআই ছিল না তখন মানুষ কোনো দ্বিধায় বা আবেগীয় সংকটে পড়লে, পরিবারের প্রবীণদের মতামত, বন্ধুর সহযোগিতা কিংবা নিজের আত্মিক বিশ্বাসের ওপর ভরসা করত। কিন্তু আজকের ‘এআইনেটিভ’ তরুণরা তাদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বারস্থ হচ্ছে এআই চ্যাটবটের। তারা তাদের মন খারাপের কথা বলছে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টকে, ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত ও ভালোবাসার মানুষের জন্য চিঠি লেখার দায়িত্বও ছেড়ে দিচ্ছে জেনারেটিভ এআইএর ওপর। মানুষ যখন তার প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে জটিল মানবিক সিদ্ধান্তগুলোও এআইএর পরামর্শে নিতে শুরু করে, তখন তার নিজস্ব বিবেক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এটি এক ধরনের ‘প্রযুক্তির দাসত্ব’ করা বলা যায়। যা মানুষের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। যার ফলে অনেক সময় তারা আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। অপরদিকে এআই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে আমাদের উচ্চশিক্ষা খাতে। ইউনেস্কো ২০২৩ সালে তাদের ‘এঁরফধহপব ভড়ৎ এবহবৎধঃরাব অও রহ ঊফঁপধঃরড়হ ধহফ জবংবধৎপয’ প্রকাশনার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়। এই নির্দেশিকায় মূলত ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ, ডাটা প্রাইভেসি রক্ষা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এআই সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর এই গাইডলাইনটি তৈরি করা হয়েছিল শিক্ষাক্ষেত্রে এআইএর দ্রুত প্রসারের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি যেমন শিক্ষা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা, পক্ষপাতিত্ব এবং ডেটা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য। এই সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে, শিক্ষা ক্ষেত্রে এআইএর যত্রতত্র ব্যবহার শিক্ষার্থীর নিজস্ব ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

আমি একজন শিক্ষক হিসেবে বলব, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থায় এআই এর গুরুত্ব অপরিসীম, তাই এআইনেটিভ সমাজ এবং তরুণদের এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরের যুগে শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু বেড়েছে তাই নয়, বরং বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল কাজ ছিল তথ্যের জোগান দেওয়া এবং পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করা। কিন্তু আজ চ্যাটবট বা এআই যখন চোখের পলকে যেকোনো তথ্য বা নোট তৈরি করে দিচ্ছে, তখন শিক্ষকের সেই পুরনো ভূমিকা শুধু শিক্ষককের উপরই থাকছে না, অধিকাংশ চলে গেছে এআই এর হাতে। শিক্ষকদের দায়িত্ব এখন কেবল সিলেবাস শেষ করা ও তথ্যকে গিলিয়ে দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর নৈতিক চিন্তা ও বিবেককেও জাগ্রত করে দেওয়া। একই সাথে সহমর্মিতা, সততা, এবং ডিজিটাল রেস্পন্সিবিলিটি বা প্রযুক্তিগত দায়িত্বশীলতা শেখানো। যাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সুশাসন। এআই এর যুগে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বিষয়গুলোও ।

আজ মানবজাতি এআই এর মাধ্যমে অনেক ধরনের নৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন একটি ভুয়া ছবি বা কণ্ঠস্বর মুহূর্তের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে, ধ্বংস করতে পারে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত চরিত্র। এই প্রবণতা সমাজকে এক চরম অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা যায় তরুণদেরই একটি অংশ অযাচিত ভিডিও তৈরি করে ভিউ আর টাকা ইনকামের উৎস হিসেবে বেছে নিচ্ছে এআইকে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়টা নষ্ট করে ফেলছে। অথচ সেই সময়টা তারা এআইকে অনেক ভালো কাজে লাগাতে পারে। তাদেরকে এই পথ থেকে বের করে আনার সমাধান কিন্তু শিক্ষক ও অভিভাবকদের হাতেই। এতকাল জোর দেওয়া হয়েছে কীভাবে ক্লাসরুম ম্যানেজ করতে হবে কিংবা কীভাবে ব্ল্যাকবোর্ড বা প্রজেক্টর ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মূল এজেন্ডা হওয়া উচিত ‘এআই এথিকস’, ‘এআই গভর্ন্যান্স’, ‘পেডাগজিক্যাল শিফট’ (শিক্ষাদান পদ্ধতির রূপান্তর) এবং ‘এআই অর্কেস্ট্রেশ’। অর্থাৎ একাধিক অও মডেল বা এজেন্টকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার দক্ষতা ইত্যাদি সমসাময়িক বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডিউলগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত করা।

প্রযুক্তি সভ্যতাকে গতি দিতে পারে, তাকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারে কিন্তু সেই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে মানুষের সততা, সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা আর নৈতিক চেতনা। আমরা যদি তরুণদের এভাবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে তখন তারা কেবল প্রযুক্তির অন্ধ ভোক্তা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাস হবে না, বরং তারা হবে এক নতুন মানবিক পৃথিবীর কারিগর যারা মেধা দিয়ে জয় করবে প্রযুক্তিকে, আর হৃদয় দিয়ে আগলে রাখবে মানবতাকে। প্রযুক্তির এই চোখ ধাঁধানো আলো যেন আমাদের ভেতরের মানুষটিকে অন্ধ করে না দেয়, বরং বিবেককে আরও উজ্জ্বল করে। আজ যদি আমরা প্রযুক্তির এই আলোর পাশে নৈতিকতার প্রদীপটি জ্বালাতে পারি, তবে ইতিহাসের পাতাই আমরাও ঠিকে থাকতে পারি অনন্তকাল।

লেখক: প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,

নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাগজে মুদ্রিত বই পড়ার অনুভূতি আলাদা
পরবর্তী নিবন্ধকোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস: যেখানে মিশে আছে ইতিহাস