আন্দরকিল্লার মোড়ের একটি সরু গলিতে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস। কাজের ফাঁকে হঠাৎই পা পড়েছিল সেখানে। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু, ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, এটি শুধু একটি পুরোনো ভবনে প্রবেশ নয়; যেন চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সামনে এসে দাঁড়ানো।
বাইরে ব্যস্ত নগরজীবন। যানবাহনের শব্দ, মানুষের চলাচল, প্রতিদিনের তাড়াহুড়া। আর ভেতরে অন্য এক আবহ। ছাপার মেশিনের একটানা গুঞ্জন, কাগজের অবিরাম চলাচল আর তাজা কালির গন্ধ মিলিয়ে যেন এক আলাদা জগৎ। মনে হলো, প্রযুক্তি বদলেছে, মুদ্রণের ধরন বদলেছে; কিন্তু অক্ষরের জন্ম দেওয়ার এই কর্মযজ্ঞের কোনো বিরাম নেই। এখানে আজও কালি মিশে যায় কাগজে, আর কাগজ মিশে যায় ইতিহাসে।
১৯৩০ সালে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম বিদ্যুৎচালিত ছাপাখানা কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস। এর আগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোহিনূর লাইব্রেরি। একজন প্রকৌশলীর দূরদর্শী উদ্যোগে প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানে। সময়ের পরিক্রমায় কোহিনূর কেবল একটি ছাপাখানা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।
পুরোনো ভবনটির ভেতর হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, দেয়ালগুলোও যেন কথা বলে। দোতলা থেকে তিনতলা, ওঠার কাঠের সিঁড়ি আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। চিলেকোঠার ছোট ছোট কক্ষ, লুভার দেওয়া দরজা, বার্মা টিকের আলমারি, প্রশস্ত বারান্দা, অলিন্দের সিমেন্টের কারুকাজে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের নামের আদ্যাক্ষর সবকিছুতেই যত্নের ছাপ, রুচির পরিচয় এবং সময়ের স্মৃতি স্পষ্ট।
প্রতিটি কক্ষ যেন একটি গল্প। প্রতিটি জানালা যেন বহু দশকের আলো–হাওয়া, মানুষ আর স্মৃতিকে নীরবে ধারণ করে আছে। পুরোনো ভবনেরও একটি ভাষা থাকে। সেই ভাষা কানে শোনা যায় না; অনুভব করতে হয় মন দিয়ে।
কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের এক গৌরবময় অধ্যায়। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল সময়ে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচনা করেছিলেন ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতা হিসেবে স্বীকৃত সেই ঐতিহাসিক কবিতা। কবিতাটি ছাপা হয়েছিল এই প্রেসেই। সেই সময় কম্পিউটার ছিল না, ডিজিটাল টাইপসেটিং ছিল না। একটি একটি করে সীসার অক্ষর সাজিয়ে তৈরি হতো শব্দ, শব্দ থেকে বাক্য, আর বাক্য থেকে ইতিহাস। তারপর ছাপার মেশিনের মধ্য দিয়ে সেই অক্ষর পৌঁছে যেত মানুষের হাতে, মানুষের মনে।
একটি কবিতা। কয়েকটি ছাপানো পৃষ্ঠা। কখনো কখনো এতটুকুই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কবিতাটি প্রকাশের পর প্রশাসনের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে এই প্রেস। প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাপার অক্ষরও যে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস তার এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
কোহিনূরের অবদান অবশ্য শুধু ভাষা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নয়। অসংখ্য বই, সাময়িকী ও সাহিত্যপত্র এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার বিকাশে এই প্রেসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দৈনিক আজাদীর শুরুর দিকের মুদ্রণকাজও হয়েছিল এই প্রেসে। পরবর্তীকালে সেই আজাদী স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদ প্রকাশ করে দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান করে নেয়।
একটি ছাপাখানার মূল্য শুধু তার যন্ত্রে নয়; তার ছাপা অক্ষরে, তার সৃষ্টি করা চিন্তায় এবং একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বয়স বছর দিয়ে মাপা যায়, কিন্তু তার গুরুত্ব মাপা যায় মানুষের স্মৃতিতে রেখে যাওয়া প্রভাব দিয়ে। সেই অর্থে কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস শুধু একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠান নয়; এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ, ভাষা আন্দোলনের অংশ এবং সংবাদপত্রের ইতিহাসেরও অংশ।
প্রেস থেকে বের হওয়ার সময় আরেকবার ফিরে তাকালাম। ছাপার মেশিনের গুঞ্জন তখনও থামেনি। নতুন কাগজ ছাপা হচ্ছে, নতুন অক্ষর জন্ম নিচ্ছে। মনে হলো, ইতিহাস কখনো কেবল জাদুঘরে বন্দি থাকে না। ইতিহাস বেঁচে থাকে সেই সব মানুষের হাতে, যারা প্রতিদিন নীরবে নিজেদের কাজ করে যান; বেঁচে থাকে সেই সব প্রতিষ্ঠানে, যেগুলো সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েও নিজেদের শিকড় ভুলে যায় না।
ক্ষণিকের সেই সফর তাই আর শুধু একটি পুরোনো প্রেস দেখা হয়ে রইল না। ফিরে এলো চেনা শহরের গন্ধ, কালির গন্ধ, পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর ফেলে আসা সময়ের স্পর্শ। মনে হলো, এই শহরের অলিগলি, পুরোনো ভবন, কাঠের সিঁড়ি, বারান্দা আর ছাপার অক্ষরের সঙ্গে আমারও এক অদৃশ্য আত্মীয়তা আছে।
চট্টগ্রাম, আমার প্রিয় চট্টগ্রাম। এই শহরেই আমার জন্ম। এই শহরেই আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। শহর বদলায়। মানুষ বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সময়কে অতিক্রম করে ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে আজও কালি মিশে যায় কাগজে, আর কাগজ মিশে যায় ইতিহাসে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার।












