উত্তমকুমার

জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি:

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ

পর্ব ১

সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারের প্রয়াণের পরে বলেছিলেন, ‘উত্তমের মতো উত্তম অভিনেতা আর হবে না।’ এক লাইনের এই কথাটি অনেক ব্যাপকার্থ বহন করে। উত্তমের জীবদ্দশায় সত্যজিৎ আরেকবার বলেছিলেন, “উত্তমকুমার কোনও পরিচালকের ব্যক্তিগত সার্টিফিকেটের অপেক্ষা রাখেন না। তিনি যে বিশ বছর ধরে একশোরও বেশি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থান অধিকার করে আছেন এটাই তাঁর কৃতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ জিনিস যে কেবল বরাতজোরে হয় না, এ বিশ্বাস আমার আগেই ছিল। আমি আশা করি তিনি আজ যে জায়গা দখল করে আছেন, সেখানে ঠিক এইভাবেই আরো বহুদিন থাকবেন।

ওঁর মতো স্টার আর হবে না। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দিকপাল। ওঁর সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আশ্চর্য অভিনয় দক্ষতা। উত্তমের মত কোনও নায়ক নেই, কেউ হবে না। উত্তমের দর্শকদের টেনে রাখার ক্ষমতা আছে। অনেক নায়ক আছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভালো অভিনয় করেন, কিন্তু উত্তমের মত কেউ নেই, কেউ হবে না।”

কথাগুলি সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ১৯৬৮ সালে। সে বছর উত্তমকুমার সত্যজিৎ পরিচালিত ‘চিড়িয়াখানা’ ও সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘এ্যান্টনী ফিরিঙ্গী’ ছবিতে অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘ভরত’ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ভারত সরকার সে বছর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য ‘ভরত’ ও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য ‘উর্বশী’ পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। সরকার ঘোষিত এই নবতম পুরস্কার প্রথমবারেই অর্জন করেন উত্তমকুমার।

তখনও পর্যন্ত উত্তম সত্যজিতের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবি দুটিতে অভিনয় করলেও এবং তখনও পর্যন্ত ২০ বছরের অভিনয়জীবনে অনেকগুলি চূড়ান্ত ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিলেও, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে কিংবদন্তী জুটি গড়ে তুললেওস্মরণীয় অভিনয়ের ছবিগুলিতে তখনও তাঁর অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি। উপরোল্লিখিত তিনটি ছবি ছাড়া তিনি তাঁর অভিনয় ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন তখনও কয়েকটি মাত্র ছবিতে; বসু পরিবার, রাইকমল, নবজন্ম, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, শুন বরনারী, সপ্তপদী, জতুগৃহ। লক্ষণীয়, এর কোনওটাই তথাকথিত ‘বাম্পারহিট’ বা ‘সুপারহিট’ নয়। কিন্তু ছবিগুলিতে উত্তমের অভিনয় দক্ষতার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর পরিলক্ষিত হয়। এ ছবিগুলিতে যে ধরনের চরিত্রে উত্তমকুমার অভিনয় করেছেন এর প্রতিটি চরিত্রই ব্যাতিক্রমধর্মী। হালকা রোমান্টিসিজম থেকে মুক্ত। প্রতিটি চরিত্রের অনেকগুলি শেড এবং চারিত্রিক বৈবিধ্য ও বৈচিত্র্যে পূর্ণ। আরও একটি বিষয় উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনে লক্ষণীয় ছিল, তিনি তাঁর রোমান্টিক অভিনয়গুলিতে হলিউডের স্টারইজমকে অনুসরণ করতেন। বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে, যা যথাযথভাবে খাপ খেতো না আমাদের পারিপার্শ্বিকতার অনুকূলে। কিন্তু যখন তিনি সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, কাবেরী, মাধবীদের বিপরীতে রোমান্টিক অভিনয়গুলো করছেন তখন সেখানে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। এই সময় (১৯৬৮) ও তার পরবর্তী সময়ে তিনি যখন তথাকথিত নায়ক চরিত্রের বাইরে চরিত্রাভিনয়গুলি করছেন, তখন প্রকৃত উত্তমকে আমরা পাই। সম্পূর্ণ মৌলিক অভিনয়, দৈহিকবাচিক উভয় ক্ষেত্রেই, পুরোপুরি এতদাঞ্চলীয় আঙ্গিকে। আরোপিত কিংবা উপরিয়ানা কোনও কিছু নেই, যা দেখা যেত রোমান্টিক অভিনয়ে। পেশাগত কারণে প্রযোজকপরিচালকদের অনুরোধ উপরোধে এসব কিছু করেছেন অনিচ্ছায় এবং চরম অতৃপ্তিতে, সে কথা বোঝা যায়। কিছু সাক্ষাৎকারেও তিনি তাঁর অনিচ্ছা, অতৃপ্তি কিন্তু বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গে বলেছিলেন।

এমন কিছু সাধারণ মানের ছবিতে তাঁকে অভিনয় করতে হয়েছিল, যেগুলো অবিন্যস্ত চিত্রনাট্য, অবান্তর সংলাপ, দুর্বল পরিচালনার কারণে রীতিমতো অবিবচ্য। যেমন; অন্নপূর্ণার মন্দির, সবার উপরে, একটি রাত, সুরের পরশে, যৌতুক, বিচারক, সখের চোর, সোনার খাঁচা, আমি সে ও সখা, সাথীহারা সহ আরও কিছু ছবি। তালিকা অনায়াসে দীর্ঘ করা যায়। এসব ছবির অনেকগুলি ব্যবসা সফল হয়েছে কেবলমাত্র উত্তমকুমারের উপস্থিতির কারণে। এই একজন অভিনেতা বছরের পর বছর পশ্চিমবঙ্গের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বলতে গেলে একাই বহন করে নিয়ে গেছেন। যাকে বলে, ওয়ানম্যান ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় রহিত অভিজ্ঞতা।

একজন অভিনয়শিল্পী যখন পরিপূর্ণ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন, অভিনয়শিল্পটি যখন পুরোপুরি তার অধিকারে চলে আসে, ঠিক সেই সময়টাতেই উত্তমকুমারকে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ( ১৯২৬১৯৮০) চলে যেতে হয়।

১৯৭০এর দশকের শুরু থেকে তিনি তথাকথিত নায়ক চরিত্র থেকে চরিত্রাভিনয়ের দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। কোনও কোনও ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি ছিল নেতিবাচক। অর্থাৎ সোজা কথায় ভিলেন। কিন্তু ‘ভিলেন’ হয়েও তিনিই ‘হিরো’। দর্শকেরা তাঁকে এ ধরনের ভূমিকাতেও সচ্ছন্দে গ্রহণ করেছেন। এসব চরিত্রে তিনি অসাধারণভাবে তাঁর অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে গেছেন। ১৯৫০ ও ৬০এর দশকেও তিনি এধরনের কয়েকটি চরিত্রে (থানা থেকে আসছি, মরুতীর্থ হিংলাজ, লাল পাথর, শেষ অংক) চমৎকার অভিনয় করলেও পুরোপুরি সাহসী হয়ে ওঠেন ৭০ এ। বাঘ বন্দীর খেলা, নিশিপদ্ম, অপরিচিত, স্ত্রী, ছিন্নপত্র (দ্বৈত চরিত্রের একটি), খনা বরাহ ইত্যাদি উত্তমের নেতিবাচক চরিত্রাভিনীত কয়েকটি ছবি।

(চলবে)

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল