যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে নৌ অবরোধ কার্যকর শুরু করেছে। বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরসংলগ্ন ইরানি বন্দরগুলোর দিকে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে। এ পদক্ষেপকে সরাসরি যুদ্ধোন্মুখ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠায় সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ইরানের নৌ সক্ষমতা ইতোমধ্যেই কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ‘হামলাকারী জাহাজ’ যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে সেগুলো ‘ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের নৌবাহিনী সমুদ্রের তলানিতে পড়ে আছে, তাদের ১৫৮টি জাহাজ সম্পূর্ণ ধ্বংস। আমরা তাদের অল্প কিছু ‘ফাস্ট অ্যাটাক শিপে’ আঘাত করিনি, কারণ আমরা সেগুলোকে তেমন হুমকি মনে করিনি। তিনি আরও বলেন, সতর্কবার্তা: এই জাহাজগুলোর কোনোটি যদি আমাদের অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে ঠিক যেভাবে আমরা সমুদ্রে নৌকায় থাকা মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই, সেই একই পদ্ধতিতে সেগুলোকেও সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করা হবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধের আওতায় থাকা এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে আটক, পথ পরিবর্তনে বাধ্য কিংবা জব্দ করা হতে পারে। তবে ইরান ছাড়া অন্য দেশের নিরপেক্ষ জাহাজ, যেগুলো সরাসরি ইরানি বন্দরে যাচ্ছে না, তাদের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না বলে দাবি করা হয়েছে। অবরোধ শুরুর পরপরই অন্তত দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি থেকে ফিরে গেছে।
এদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ ও ‘দস্যুতার শামিল’ বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে তেহরান। শত্রুপক্ষ–সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। এছাড়া উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর উদ্দেশে সতর্কবার্তায় ইরানের সেনাবাহিনী বলেছে, এই অঞ্চলের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা ‘সবার জন্য, নতুবা কারও জন্যই নয়’। যদি ইরানের বন্দরগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এক মুখপাত্র আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধের হুমকি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং এটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। তবে পরিস্থিতি সামরিক দিকে মোড় নিলে ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তার বক্তব্যে পরিষ্কার, তেহরান এখনো পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষ এড়াতে চাইলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি ধরে রেখেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, গত শনিবার মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ওমান উপসাগরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থান করছে, যা ইরানি উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দক্ষিণে। উপগ্রহের ছবি দৃশ্যমান আরও দুটি কাছাকাছি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যা আকার ও গঠনে মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড–মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে মিলে যায় বলে জানিয়েছে বিবিসি। এগুলো ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ হতে পারে। এ ধরনের অবস্থান সাধারণত সরাসরি সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত বহন করে এবং সংকট দ্রুত তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ; প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অবরোধের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াবে।
চীনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, এবং সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক স্তরে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত, এটি সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে; দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়লে তা বৃহত্তর সংঘাতে পরিণত হতে পারে; এবং তৃতীয়ত, এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।














