আষাঢ়ের বাদল দিনে মনে পড়ে আমার গ্রামের কথা, বাড়ির সামনে জলে টইটুম্বুর ছোট নদীর কথা, আর মনে পড়ে জলেভাসা জমিতে বাবার হালচাষের কথা।
আমি তখন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ি। বর্ষাকাল। একটা জুঁইর (ছাতার বিকল্প গ্রামীণ সামগ্রী) মাথায় দিয়ে বিলে–বিলে হাঁটছি। মাইকে ভেসে আসছিল একটি গান, ‘আইস্যেরে আষাঢ় মাস/আসমান মাতের গুজুরি/মেঘ রাজার সাত কইন্যা/যাইব শ্বশুর বাড়ি’। আষাঢ়ের আকাশে মেঘ রাজার কন্যাদের বিয়ে হয়, আর জমিনে বাজে ধানরোপণের গান।
আবদুইল্লাহ ঘুমত্তুন উঠ
দাঁত ডলি ধুই আগৈ মুখ
ক্ষের চালাই দে গরুর গোয়াইলত।
তোর দাদী আছে অওলাত
দুয়া পঅছ নে চাগৈ পানিভাত
তরাতরি আল লই যা বিলত।।
(কথা, সুর ও শিল্পী : সিরাজুল ইসলাম আজাদ)
আষাঢ়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামে, বৃষ্টিতে হালের জমি নারীহৃদয়ের মতো কোমল হয়। এমন বৃষ্টিদিনে বাবা ছেলেকে ডেকে বলে, ‘অপুত আল ফালানীর ডঅর থাইম্যে, বিলত আল (হাল) লই যা।’
কক্সবাজার অঞ্চলে শব্দটা ‘আল ফালানী’ হলেও বরেণ্য গবেষক আবদুল হক চৌধুরী শব্দটাকে ‘হাল পালনী’ বলেছেন। তিনি তার ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ গ্রন্থে একটি প্রচলিত প্রবাদেরও উল্লেখ করেছেন…
‘হাল পালনী হাথ দিন
দেবায় করে রাতদিন’।
এখানে ‘হাথ’ মানে সাত, ‘দেবা’ মানে বৃষ্টি। অর্থাৎ আষাঢ়ের প্রথম সাতদিন অঝোরে বৃষ্টি নামে। আচ্ছা, ‘হাল পালনী’ ও ‘ডঅর’ মানে কি?
আষাঢ়ের প্রথম সাতদিনের বৃষ্টিধারাকে ‘ডঅর’ বলা হয়। অতীতে চট্টগ্রামের মানুষ হিন্দুুমুসলমান নির্বিশেষে বিশ্বাস করতেন এই সাতদিন পৃথিবীর রজস্বলা হয়, এই সময়ে জমি চাষ করা মানা, এটাকে বলা হয় ‘হাল পালনী’। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, ‘হাল পালনী’র সাতদিন হালচাষ করা ‘ঋতুবতী নারীগমন’ করার মতো পাপ।
‘কত কতেক মওলানাতে কেহ যদি পুছে
হাল পালনের কথা বোলে শাস্ত্রে আছে।
আষাঢ়ের সপ্ত দিনে রজঃ পৃথিম্ভিরে
উদরত্তুন ভগস্থলী নিকালে বাহিরে।
তে কারণে সপ্ত দিনে হাল ন জুড়িব
হাল জুড়ে সেসকল মরকে পড়িব।
(ড. আবদুল করিম সম্পাদিত নসরুল্লাহ খোন্দকারের শরীয়তনামা, পৃষ্ঠা ১৮)
পুরকালে চট্টগ্রামের মুসলমানদের একাংশ ‘হাল পালনী’র সময় দেবী বসুমতীর সন্তুষ্টির জন্য ‘মারি পিঠা’ প্রস্তুত করত এবং তা নিয়ে জমির মধ্যে ফাতেহা দিত।
হাল পালনের পিঠা লবণ দিব,
ক্ষেতির মধ্যে নিয়া বলে ফাতেহা করিব।(প্রাগুক্ত)
অবশ্য শরীয়তনামায় ‘মারি পিঠা’ বলা হলেও কক্সবাজার অঞ্চলে এটার নাম ‘মালি পিঠা’। বিন্নি চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় মালি পিঠা। এই পিঠার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি যথেষ্ট আঁঠালো। কাঁঠাল আর দুধ দিয়ে এই পিঠা খাওয়া হয়। হালচাষ শুরুর সময় চাষিরা এই পিঠা ক্ষেতের এককোণায় রেখে দেয় এই মানতে যেফলন ভালো হবে, এটাই ‘বসুমতী ফাতেহা’।
সোম শুক্কুরে রোয়ে ধান
চট্টগ্রামের হিন্দুমুসলমান উভয় সমাজে বর্ষা মৌসুমে প্রথম হালচাষে কিছু নিয়ম ও আচার পালন করা হয়। প্রাচীন কবি বলেছেন,
কত কত মুসলমান হাল লামাইতে
ডিম্ব এক মধ্যে রাখি চাষে চারি ভিতে।
কেহ কেহ আম্র ডাল, কুপি মধ্যভাগে
চারি পাশে হাল জোড়ে, যেন চক্র লাগে।
(ড. আবদুল করিম সম্পাদিত নসরুল্লাহ খোন্দকারের শরীয়তনামা)
অর্থাৎ ‘হাল পালনী’র সময় হিন্দুদের মত মুসলমানরাও জমির মধ্যখানে একটা ডিম বা আম গাছের ডাল পুঁতে রেখে চারিদিকে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে জমি চাষ দেন।
প্রথম ধান রোপণের দিন চাষি পরিবারে লক্ষী শাক রান্না করা হয়। চট্টগ্রামে কচু শাককে লক্ষী শাক বলা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস যে, প্রথম ধান রোপণের দিন লক্ষী শাক দিয়ে ভাত খেলে দেবী লক্ষীর কৃপায় জমিতে দারুণ ফলন মিলবে।
ধান রোপণ ও কাটায় চাষিরা শুভাশুভ রীতিও মেনে চলতেন। নির্দিষ্ট দিনে ধান রোপণ ও কাটাকে শুভ মানা হতো। এ বিষয়ে একটা প্রচলিত প্রবাদ হলো…
সোম শুক্কুরে রোয়ে ধান
বুধ বিষুধে ঘরে আন।
অতি ফলন, অতি সন্দুরে মানুষের ‘মুখ পড়ে’। এটাকে চট্টগ্রামের ভাষায় বলে ‘ফুয়ার/ওঁয়ার পড়া’ (মুখদোষ)। সন্তানের গায়ে জ্বর উঠলে মা তাড়াতাড়ি কিছু গ্রামীণ উপকরণ সন্তানের সারা শরীর ছুঁয়ে চুলায় জ্বালিয়ে দেয়। এটাকে বলে ‘ফুয়ার বা ওঁয়ার পোড়া’। ফলবান ক্ষেতের ‘মুখদোষ’ রোধ করার জন্য চাষিরা চুনের ফোটা দিয়ে চিত্রিত করা কালো পাতিল খুঁটির মাথায় টাঙিয়ে দেন।
বিয়ার ডাকা
গ্রামে ‘বিয়ার ডাকা’ বলে একটা আচার একসময় খুব চালু ছিল, বিশেষ করে, কক্সবাজার অঞ্চলে এই সংস্কৃতি অতি জনপ্রিয় ও চালু ছিল, এখন বিলুপ্তপ্রায়।
প্রচলিত অর্থে ‘বিয়ার দেওয়া’ মানে হলো বেগার খাটা। তবে হালচাষে বিয়ার ডাকা মানে শ্রমোৎসব। অর্থাৎ অনেকে মিলে বড় কোন কাজ স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা। বিনিময়ে পারিশ্রমিক নয়, পেটপূজার আয়োজন করা হয়। ধরুন, কোন গৃহস্থের এক দাগে ৫ কানি (দুই একর) জমি আছে। সেই জমিতে ৪ জন শ্রমিক ৫ দিনে ধান রোপণ শেষ করতে পারবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গৃহস্থ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োজিত না করে ‘বিয়ার’ ডাকলেন। হাঁটে ঢোল পেটানো হলোুঅমুক তারিখে অমুকের বাড়িতে বিয়ার। নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের জোয়ানবুড়ো সবাই গৃহস্থের বাড়িতে উপস্থিত হলেন, পানতামাক খেলেন। শ’খানেক মানুষ এক ঘণ্টার মধ্যে গৃহস্থের জমিতে ধান রোপণ সম্পন্ন করলেন। এটা একটা উৎসব। একদল মানুষ হালচাষ দিয়ে জমি তৈরি করছেন, অন্যদল বীজতলা থেকে চারা তুলেছেন, আরেক দল ধানের চারা রোপণ করছেন। আর জমির আইলে গায়েন গাইছেন ভাইট্টালি, ঢুলী নাচছেন ঢোলের তালে। পাড়ার বৌঝিরা মুখে ঘোমটা দিয়ে দেখছেন তামাশা। ধান রোপণ শেষে দল বেঁধে সবাই গেলেন গৃহস্থের বাড়িতে। সকালে গরু বা ছাগল জবাই করা হয়েছে। ধান রোপণ শেষ হবার আগেই মেজবানি মাংসের খুশবো মৌ মৌ করছে পাড়াময়। ‘বিয়ার’এ অংশ নেওয়া মানুষরা পেট ভরে খেয়ে বাড়ি চলে গেলেন। রাতে সেই গৃহস্থের বাড়িতে বসল গাইনের গানের আসর। আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমাদের গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় এমন এক আসরে সোবহান গাইন আর মোহনবাঁশীর গাজীর গান দেখেছিলাম। সেদিন গাজীকালুর পালা হয়েছিল। মোহনবাঁশী গাইনের একটি পদ এখনো মনে আছে…
পাঁচ তোলা কইন্যা আছিলি পাঁউচ্চা ফুলর ভর
রাইতে রাইতে কেনে অলি পাচমণি পাথর।।
হেরা, বব্বঅ, তিতি
লেখা শেষ করার আগে হালচাষের সরঞ্জামগুলোর কথা একটু মনে করিয়ে দিই। নাকল (লাঙল), ঈষ, জোয়াল, হোঁয়ালী, নাফা, কোঁওর হলো হাইল্যার সরঞ্জাম। গরু যাতে উল্টা আচরণ না করে সেজন্য তার নাকে নাফা দেওয়া হয়। চাষির কাজে আরও যেসব জিনিস অপরিহার্য সেগুলো হলো–আট্টা, জালার মুডা, ফুঁইচা, ভাঁইর, লাই, বউক, ধাইজ্জা, তলই, ডোল, গোলা ইত্যাদি।
গরুকে যেসব নির্দেশনা দিয়ে হাল চাষ করা হয় সেগুলে হলো–
হেরা বা এরা : বাম দিকে যাও
তিতি : সোজা যাও
বব্বঅ : এবার থাম
হাইল্যা গীত ও হাইল্যা সাইর
হাইল্যারা যেসব গান করেন সেসবকে হাইল্যা গীত বলা হয়। একসময় গ্রামেগঞ্জে দারুণ জনপ্রিয় ছিল এই গান। এসব এখন বিলুপ্তপ্রায়।
একটা ‘হাইল্যা সাইর’ শোনাই এবার…
আগে মানম আল্লাহ রসুল, মানম রে পয়গম্বর
বাংলাদেশ্শান মানি লইলাম, নিজর জন্মস্থান।
সেদিন ফেসবুকবন্ধু নুরুল আলম একটা হাইল্যা গীত শোনালেন, ‘হাইল্যা থাকে চাং ঘরে/গিরিচ থাকে বঅর ঘরে/হাইল্যা ভাইয়র চাং ঘরত/নিত্তি ঝর পরে।’
বিলুপ্তপ্রায় একটা হাইল্যাগীত শুনিয়ে বিদায় নেব…
শুনরে খবর লে ভাইয়ান, জানরে খবর
রোয়াং শহর বেরাই আইলাম, রাজার বিল সুন্দর।
মাঝে মাঝে রে টইনর ঘর
আরি মাপি বেচে ধান, ননাইয়া সদর।
(বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, কক্সবাজার, বাংলা একাডেমি)
লেখক: সাংবাদিক ও চট্টগ্রামের লোকসংগীত গবেষক










