আশকর আলী পণ্ডিতের গান

ইকবাল হায়দার | রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে তিনটি ভিন্ন রূপ বিদ্যমান যেমন: একখাঁটি চাটগাঁইয়া বা চাডি, দুইরোসাংগিরী বা রোয়াই (চাটগাঁতে বলে), তিনহিন্দুয়ানী। তেমনি চট্টগ্রামের সংগীতেরও ত্রিধারা বর্তমান। যেমন : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান। খমাইজভাণ্ডারি গান ও গলোকগীতি, যার অন্তর্ভুক্ত মরমী গান, আধ্যাত্মিক, ভাবগান, কবি গান, গাজীর গান, বারোমাস্যা, হালদা ফাডা গান, হাইল্যাসারি, পাইন্যাসারি, পল্লীগীতি, মারফতি, কীর্তনপালা, দেহতাত্ত্বিক, জারী, সারি, হঁঅলা, পুঁথি, বারোমাসী, ঘুমপাড়ানি গান, বিচ্ছেদ আরো কত কী। দুর্ভাগ্য, এগুলোর অধিকাংশ বিলুপ্তির পথে।

আবার এ সকল গান যারা লিখে গেছেন, সুর দিয়েছেন ও গেয়েছেন তাদের মধ্যে আশকর আলী পণ্ডিত উল্লেখযোগ্য। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, লোককবি, লোকশিল্পী, পুঁথি রচয়িতা, বহুগ্রন্থের প্রণেতা কালজয়ী পুরুষ।

তিনি লিখেছেন মরমী গান, আধ্যাত্মিক গান, দেহতাত্ত্বিক গান, আঞ্চলিক গান, সমাজ সচেতনতামূলক অসংখ্য লোকগান যার অনেকগুলো আজো উদ্ধার করা যায়নি, দুষ্প্রাপ্য।

আমরা আরো বিস্ময়ে দেখি, কী গঠনে, কী কাঠামে, কী মোহময়, মায়াময়, নান্দনিক শব্দের গাঁথুনিতে, সুরে, ছন্দে, গভীর ভাবে, মর্মে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যে দুটি গান সৃষ্টি থেকে আজো সমান শ্রুত, সমাদৃত, দেশসহ দেশের বাইরে বিপুল জনপ্রিয় তার একটি দেহতাত্ত্বিক গান।

ডালেতে লরিচরি বইয় চাতকী ময়না রে’ এ গান গভীর ভাব সমৃদ্ধ, যেখানে জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার বিরহ এবং লৌকিক রূপকের আড়ালে মরমী দর্শন প্রকাশ পেয়েছে, অন্যটি কিছুটা বিচ্ছেদী, কিছুটা মরমী ও আধ্যাত্মিক, ‘কি জ্বালা দি গেলা মোরে’। আর এ গান দুটির রচয়িতা, সুরকার আর কেউ নন চট্টগ্রামের কৃতী পুরুষ আশকর আলী পণ্ডিত।

গান দুটির কথা নিম্নরূপ দেয়া গেল যেহেতু দেশের অনেক বিশিষ্ট ও নামকরা কণ্ঠশিল্পী এ গান দুটি ভুলভাল কথায় গায়, তাদের শুদ্ধিকরণের জন্য :

ডালেতে লরিচরি বইয় চাতকী ময়না রে

গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও।।

ওরে চাতকী ময়না,

অংগ তোর কালা

ময়না অংগ তোর কালা

তোর মনে আর আঁর মনে

এক্কই প্রেমের জ্বালা

চাতকী ময়না রে।।

মনে হইলে চাতকিনী

নদীর পানি খাইও

ফুল মধু খাইত চাইলে

ফুল বনে যাইও

চাতকী ময়না রে।।

দক্ষিণমুখী হইলেরে ময়না

বাতাস লাগে গায়রে ময়না

বাতাস লাগে গায়

পশ্চিমমুখী হইলেরে ময়না

অংগ জ্বলি যায়

উত্তরমুখী হইলেরে ময়না

শীতে খাইব চাইয়

কনদিন আইব পরাণ বন্ধু

আগে মোরে কইও।

কহে হীন আশকর আলী সময় হইলে পরে

মাধব বৈরাগীর সনে মিলাই দিয়ম তোরে

চাতকী ময়না রে।।

অন্যটি,

কি জ্বালা দি গেলা মোরে

নয়নের কাজল পরাণের বন্ধু রে

ন দেখিলে পরাণ পোড়ে।।

ন রাখি মাটিতে, ন রাখি পাটিতে

ন রাখি পালংকের উপরে

সিঁথির সিঁদুরে রাখিব বন্ধু রে

বেরিয়ে রেশমি ডোরে।।

বন্ধু পরবাসী পরের ঘরে আসি

এত ঘুমে কেনে ধরে

কোয়েলায় করে ধ্বনী

পোহাইল রজনী

ন ডাকি ননদীরে ডরে।।

বন্ধুর প্রেমগাছে কি টোনা ধইরাছে

বসন খইসা খইসা পড়ে

আশকর আলী বলে শত সাধুদলে

উদাসী করিল মোরে।।

আশকর আলী পণ্ডিতের অনেক গ্রন্থ সম্পর্কে আমরা জানি যেমন, জ্ঞান চৌতিশা, পঞ্চসতী প্যায়ারজান, নীলপথি, চম্পাবতী, চাতক, বর্গশাস্ত্র, হাফেজ বাহাদুর, নন্দ বেহার, নন্দক বিলাস, গীত বারোমাস, সতীসংগিনী, নন্দ সাগর, আজল বকসু, সোনাইর বারোমাসী, চান্দ্রমাস, থমিম জালাল তবে গীত রচনাসমৃদ্ধ পৃথক কোন গ্রন্থের সন্ধান এখনো দৃষ্ট নয়, যা আছে বিচ্ছিন্ন, মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

চট্টগ্রামের লোকসংগীতের বিশেষ কিছূ দিক রয়েছে কথায়, ভাবে, মর্মে, আছে সংগীতের প্রাণ এবং যেগুলি প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যে ভরপুর।

সেই সুবাদে আমাদের সংগৃহীত আশকর আলী পণ্ডিতের রচিত নিম্নোক্ত গান সমূহ মানুষের মনকে দারুণ ও প্রবলভাবে নাড়া দেয়। বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও উল্লেখ্য যে তাঁর গানের ভাষা শুদ্ধ ও আঞ্চলিক উভয় শব্দে সমৃদ্ধ ও মেশানো।

তাঁর রচিত আধ্যাত্মিক, দেহতাত্ত্বিক, ভাব, বিচ্ছেদ, মরমী ছাড়াও রাধাকৃষ্ণ লীলা, প্রেম , পিরিতি, বিরহ গীতি, কানু, রাধা, শ্যাম, কালা চিকনকালা, ত্রিবেণীঘাট, বৃন্দাবন, কানু, রাধা, মুরলী, যমুনা, কদমতলা, নারীর আর্তি, বেদন বিষয়ে আছে বহু গান। আবার মানব প্রকৃতি, বিশ্বনিয়তি, চিরাচরিত রীতি, সমাজ, সংসার ও বাস্তবতার কথা আছে তাঁর গানে।

যেমন, তিনি এক গানে লিখেছেন, ‘যে নারী চতুরা হয় / সোয়ামীর প্রেমে মজি রয়। বা, ‘ফুলের মধু খাইয়া বন্ধু/ বাসি অইলে ফেলি যায়’। বা, ‘জালিয়া চিনে গংগা তিথি মালিয়া চিনে ফুল / শটমনে প্রেম করিয়া হারাইলাম দুই কুল’। ( এ গানে আধ্যাত্মিকতার চরম অভিব্যক্তি দেখা যায়)। বা ‘ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া / মনর আশা ন পুরালি’। (আধ্যাত্মিক গান) ইত্যাদি।

আশকর আলী পণ্ডিতের লোকগানের ভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ। এসব গান এখনো অনেক শিল্পী ও লোকসমাজে সমাদরে শ্রুত, গীত। অনেক গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও বিপুল জনপ্রিয়। যদিও সময়, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে তাঁর অনেক গান নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু হারিয়ে গেছে বা তথ্য মতে অনেক গান পুড়ে ছাই হবার কারণে সে সব আর উদ্ধার করা যায় নি। এ ছাড়া আরো অনেক গানে ভাব, ভাষা, শব্দ প্রয়োগে মুন্সিয়ানার ছাপ দৃষ্ট হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, লোক সংগীত গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাতি ও মানুষের সংঘাত