বাংলা আভিধানিক ভাষায় ‘আত্মীয়’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। আত্মীয় শব্দের অর্থ হল আপনজন, স্বজন, বা জ্ঞাতি। পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরীফে আত্নীয়ের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে। বিশেষ করে আত্মীয়ের সম্পর্ক বজায় রাখা ও হক আদায়ের উপর মহান আল্লাহ পাকের কঠোর নির্দেশনা এসেছে। যার সার সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায় যে, মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন শরীফে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র হাদিস শরীফে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা বলে উল্লেখ করেছেন। সুখে দুঃখে কাছাকাছি থেকে পরস্পরের সহযোগিতা করার কথা এসেছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরীফে আত্নীয়তার সম্পর্কে এভাবে আরো বিশদভাবে বর্ণনা এসেছে।
এছাড়াও পৃথিবীর সকল ধর্মে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা সবকিছু জেনে শুনেই আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে খুবই উদাসীন। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে আত্নীয়ের হক আদায় এবং আত্মীয়ের প্রতি সঠিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে চরম অবহেলা দেখা যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে কারও কোন বিপদ এলে কিংবা দুঃসময়ে অনেক নিকটাত্নীয়রাও দূরে সরে যায়। এসমস্ত কারণে বর্তমান সময়ে আত্মীয়ের সুসম্পর্ক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে আমার মতে, আত্মার সম্পর্ক থেকে আত্নীয় শব্দটির উৎপত্তি। আত্মার ও আত্মীয় শব্দ দুটি ভিন্ন হলেও একে অপরের পরিপূরক। তাই আত্মার সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় হলে আন্তরিকতা বজায় থাকে অনন্তকাল। ফলে সুখ–দুঃখ, বিপদ–আপদ, আচার–অনুষ্ঠানসহ সকল প্রয়োজনে একে অপরের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে আন্তরিকতা নিয়ে কাছে থাকার মাঝে আত্মীয়তার মূল স্বার্থকতা নিহিত থাকে। এতে পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সম্পর্কের বন্ধন সমৃদ্ধ হয়। ফলে পারিবারিক মান–মর্যাদার সুনাম বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও মাতৃ–পিতৃস্থানীয় জন্মগত বংশীয় ঐতিহ্যের পরিচয় শাণিত হয়। সামাজিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। অপরদিকে এর বিপরীতে সবকিছুই গুরুত্বহীন হয়ে উঠে। আবার গুরুত্বহীন হওয়ার চেয়ে দূরত্ব বজায় রাখা শ্রেয় বলে মনে করি। বিশেষত: ধনী – গরীব, অর্থ–সম্পদ, দুর্বল–সবল ইত্যাদি শ্রেণিগত ভেদাভেদে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার একমাত্র অবলম্বন হতে পারে না, যা কখনও কাম্য নয়। অন্যদিকে স্বার্থ রক্ষা করা ও স্বার্থ আদায়ের জন্য শুধু আত্নীয়ের পরিচয় বহন করাও সমীচীন নয়। বর্তমান সময়ে বলতে গেলে পুরনো আত্মীয়ের সম্পর্ক সমাজ ও পরিবার দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পুরনো আত্মীয় স্বজনের সাথে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক তেমন একটা নেই বললে চলে। যা বাস্তবতার ব্যস্ততার মাঝে অনেকের কাছ থেকে নিকটাত্নীয়রাও দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে। মানবজীবনের জন্য এটা একটি নেতিবাচক দিক। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আত্মীয়ের সম্পর্কটিও একসময় বিরল দৃষ্টান্তের পরিচয় বহন করবে।
সর্বোপরি সকল অবস্থায় আন্তরিকতার মাঝে আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। তাই মানবিক মনুষ্যত্ব বিকাশে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আত্নীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করতে সকলের জন্য দায়িত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করা অনস্বীকার্য।










