উড়ে গেলেন খাঁচা ভেঙে অজানা আকাশে উপমহাদেশের গানের শান্ত পাখি সুমন কল্যাণপুর। স্বর্ণযুগের গানের শেষ জীবিত প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে অবিস্মরণীয় সে যুগের অবসান হলো। এই যুগের সংগীতের শিল্পী কলাকুশলীরা কেউই নিছক শিল্পী গীতিকার সুরকার ছিলেন না, ছিলেন একেকজন সুর সাধক–সাধিকা, সংগীত তাঁদের কাছে প্রচার ও উপার্জনের মাধ্যম ছিল না, ছিল উপাসনার আধেয়। এ–কারণেই সেই স্বর্ণযুগে রচিত, সুরারোপিত ও গাওয়া প্রায় সব গানই অমরত্ব অর্জনে সমর্থ হয়েছে। যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই গানগুলি বয়ে চলেছে কালকে উত্তীর্ণ করে সময়ের নিরন্তর স্রোতধারায়।
মাত্র শ’পাঁচেক গান নিয়ে একজন কন্ঠশিল্পী অমরত্বকে ছুঁতে পারেন, হয়ে উঠতে পারেন কিংবদন্তী, সর্বজন শ্রদ্ধেয়–এরকম দৃষ্টান্ত নিতান্তই বিরল। সুমন কল্যাণপুর ছিলেন সেই বিরলদের অন্যতম। ব্যক্তিজীবন ও শিল্পী জীবনকে যিনি সম্পূর্ণ রূপে পৃথক করে রাখতে পেরেছিলেন। শান্তস্নিগ্ধ, পরিশীলিত ও অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী সুমন ছিলেন আপামর শ্রোতার কাছে শ্রদ্ধাশীলা একজন শিল্পী। তাঁর প্রয়াণের পর বাংলাদেশের সামাজিক প্রচার মাধ্যম জুড়ে কয়েকদিন ধরে তাঁর স্মৃতিতে অবিরত শ্রদ্ধ নিবেদন, মূল্যায়ন এবং তাঁর গাওয়া গানের আপলোড দেখে প্রতীয়মান হলো তিনি বাংলাদেশেও কতোটা জনপ্রিয় ছিলেন।
অথচ সুমন কল্যাণপুরের গাওয়া বাংলা গান মাত্র ১৬ টি। ১৪টি বেসিক আধুনিক ও দুটি চলচ্চিত্র সংগীত। বাংলা সিনেমার প্লে ব্যাকে তিনি দুটি মাত্র গান গেয়েছেন দীর্ঘ বিরতিতে। প্রথমটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় মনিহার ছবিতে ১৯৬৬ সালে। দ্বিতীয়টি ১৯৭৯ সালে নীতা সেনের সংগীত পরিচালনায় কৃষ্ণ সুদামা ছবিতে। তাঁর প্রথম বেসিক বাংলা আধুনিক গান রেকর্ড করা হয় ১৯৬৫ সালে। মুকুল দত্তের কথায় ও কানু ঘোষের সুরে সে দুটি গান ছিল যথাক্রমে ‘এই চন্দ্রমল্লিকাতে’ এবং ‘রঙের বাসরে যদি ভুলের আগুন লেগে যায়’। প্রথম রেকর্ডই সুমন শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন নেন। এরপর ১৯৬৬, ৬৭, ৬৮,৭০,৭১ ও ৭৩ এই ছয় বছরে প্রতি পূজায় তাঁর ২টি করে গান প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর তিনি আর কোনো বাংলা বেসিক আধুনিক গান করেননি। অনেক পরে ১৯৭৯ সালে কৃষ্ণ সুদামা ছবিতে তাঁর গাওয়া শেষ বাংলা গান, ‘তোরা হাত ধর প্রতিজ্ঞা কর’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। গানটি ছিল দীর্ঘ। ১৯৯৭ সালে গাওয়া শেষ দুটি বাংলা আধুনিক ছিল মুকুল দত্তের লেখায় ও রবীন বন্দোপাধ্যায়ের সুরে; ভাবিস না রে কাঁদছি বসে এবং ব্যথা হয়ে কেন ফিরে এলে বঁধুয়া। মুকুল দত্ত ও রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলা গানে সুমন কল্যাণপুরের রসায়ন ছিল অসাধারণ। এই ত্রয়ীর কবিতাধর্মী আর দুটি অনবদ্য গান ‘আকাশ অজানা তবু’ (১৯৭০) এবং ‘পায়ের চিহ্ন নিয়ে পড়ে থাকা পথটার গায়ে।’ বাংলা আধুনিক গানে এই দু’টি গান অবিস্মরণীয়। সুমনের ১৪টি বাংলা আধুনিকের ছয়টি এই জুটির এবং ১৪টি গানের মধ্যে ১০টির গীতিকার মুকুল দত্ত এবং বাকি ৪টি পুলক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা।
সুমনের বাংলা উচ্চারণ এতটাই নিখুঁত ছিল, তাঁকে বাঙালি বলে ভুল করতেন অনেকে। অবশ্য সূত্রে অনেকটাই তাই ছিলেন। ঢাকাতে জন্ম এবং ৬ বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকাতেই ছিলেন। বাঙালি শ্রোতারা তাঁকে জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও সসম্মানে সমাদৃত করে রেখেছেন যেন তাই। উনার ১৬ টি বাংলা গানই তাই সহজলভ্য।
‘সুমন’ নামটি নিয়ে বাঙালি শ্রোতাদের মধ্যে খানিকটা দ্বিধা ছিল, নামটিকে পুরুষবাচক মনে করে। ‘সুমন’ সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ‘পুষ্প’ বা ‘ফুল’। কাজেই নামটি পুরুষ–নারী উভয়ের হতে পারে। অবাঙালি মেয়েদের ক্ষেত্রে এই নামটি অধিক লক্ষনীয়। যদিও বাঙালিদের মধ্যে এর বিপরীতটাই দেখা যায়।
সুমন কল্যাণপুর বাংলা, হিন্দি, গুজরাতি, মরাঠি, অহমিয়া, উড়িয়া, কন্নড়, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি, মৈথিলি, মালয়ালম ও তামিল ভাষায় গান করেছেন এবং সেসব গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। বস্তুত তাঁর কোনো অজনপ্রিয় গান নেই। খুব নির্বাচিতভাবে গান করতেন শুদ্ধস্বর ও স্পষ্ট শুদ্ধ উচ্চারণে। গেয়েছেন সীমিত, কিন্তু অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে যাতে কোনো গান শ্রোতাবিমুখ ও শ্রোতাবিস্মৃত না হয়। পেশাদার হলেও অর্থকরীভাবে সংগীতকে নেননি। এর অন্যতম কারণ ‘পৈতৃক ও বৈবাহিকভাবে আর্থিক স্বচ্ছলতা। তবে এর পাশাপাশি খুব আত্মসচেতন ও সুবিবেচক ছিলেন সংগীত ও অংকনশিল্পের বিষয়ে। উঁচু মানের অংকনশিল্পী ছিলেন। প্রদর্শনীও করেছেন। সংগীত থেকে অবসর নিলেও আঁকাআঁকিতে নিয়োজিত ছিলেন শেষ পর্যন্ত। আর ছিলেন সুদক্ষ একজন সূচিশিল্পী। মুম্বাইয়ের জে জে স্কুল অব আর্টসে অংকনশিল্পে অধ্যয়ন করেছেন।
শৈশব থেকে সংগীতে আগ্রহ থাকলেও কন্ঠশিল্পী হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তবে নূরজাহানের পাঁড়ভক্ত ছিলেন। স্কুলের অনুষ্ঠানে নূরজাহানের গান গাইতেন। সেরকম এক অনুষ্ঠানে পুনের প্রভাত ফিল্মসের সংগীত পরিচালক প্রখ্যাত মরাঠি সুরকার কেশব রাও ভোলে সুমনের শ্রুতিমধুর কন্ঠ শুনে বিমোহিত হন এবং সুমনের বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে মেয়ের অসাধারণ প্রতিভা নষ্ট না করতে অনুরোধ করেন। বাবা মায়ের অনুমতিক্রমে কেশর রাও ভোলে সুমনকে তালিম দেয়া শুরু করেন। এরপর উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন মুম্বাইয়ের উস্তাদ আবদুর রহমান খান ও পন্ডিত নবরং রাও–এর কাছে। এ সময় মূলত মার্গ সংগীতই করতেন। ধ্রুপদী সংগীতের রেকর্ডও প্রকাশিত হয়েছিল। পরে পন্ডিত কেশব রাওয়ের পরামর্শে লঘু সংগীতে আসেন। ১৯৫২ সালে মুম্বাই বেতারে প্রথম গান করেন সুমন। ১৯৫৪ সালে হিন্দি ছবি মাঙ্গুতে প্রথম প্লে কেশব রাওয়ের সুরে। এরপর থেকে একে একে শংকর জয়কিষণ, নওশাদ, রৌশন, মদনমোহন, শচীন দেববর্মন, ওপি নায়ার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অনেক নেপথ্যে সংগীত করেছেন। হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতে তিনি বেশি সচ্ছন্দ ছিলেন মদনমোহন, শচীন দেববর্মন ও শংকর জন কিষণের সুরে। দ্বৈত সংগীত গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, মুকেশ, তালাত মাহমুদ ও মোহাম্মদ রফির সঙ্গে। তবে মোহম্মদ রফির সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। ১৪০ টি। দুজনের বোঝাপড়া ছিল খুব ভালো। এছাড়া আরো একটি কারণ রয়েছে ১৯৬০–এর দর্শকের মাঝামাঝি কন্ঠশিল্পীদের রয়্যালটি প্রাপ্তি সংক্রান্ত আন্দোলন নিয়ে লতা মঙ্গেশকর ও মোহাম্মদ রফির মধ্যে সৃষ্ট মনোমালিন্যের কারণে তাঁরা দুজন একসঙ্গে গান গাওয়া বন্ধ রাখেন বেশ কয়েকবছর।
এই সময়টাতে মোহাম্মদ রফির সঙ্গে ডুয়েট গানে অপরিহার্য হয়ে পড়েন সুমন কল্যাণপুর। পরে লতা রফির মনোমালিন্য কেটে যায়। রফিও রয়্যালটির দাবি মেনে নেন। কিন্তু তারপরও রফি সুমন ডুয়েটও গেয়েছেন। দ’ুজনের কন্ঠের স্কেলের চমৎকার সাযুজ্য শ্রোতাদূত ছিল।
লতার কন্ঠের সঙ্গে সুমনের কন্ঠের সাদৃশ্য ছিল। যা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুমনের জন্য। তবে মনোযোগে শুনলে দু’জনের কন্ঠের পার্থক্য অবশ্যই বোঝা যায়। সুমনের কন্ঠের বুনন ও গায়কী সম্পুর্ণ ভিন্ন। তবুও শ্রোতারাও অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়তেন। সুমনের গানকে অনেক সময় লতার গান বলে গণ্য করা হয়েছে। সুমনের গানকে জেনে না জেনে অনেক সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে লতার অ্যালবামে। অনেক সময় তাঁর জন্যে নির্ধারিত গান কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়েছে কনসার্ট থেকে। নানভাবে তাঁকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতকিছুর পরেও অর্ন্তমুখী এই শিল্পী কখনও এসব নিয়ে কোনও উচ্চবাক্য করেননি। কোথাও প্রতিবাদ করেননি। নিজের মতো গেয়ে গেছেন নিভৃতচারী শিল্পী। কনসার্ট তিনি এমনিতেও করতে চাইতেন না। কারণ গান ছিল তাঁর কাছে আরাধনা। পণ্য নয়। জীবনের শেষ প্রান্তেও সুমনের কন্ঠমাধুর্য ছিল অটুট। পদ্মভূষণ প্রাপ্তির পর একটি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে ৮৬ বছর বয়সে অপূর্ব সুরেলা কন্ঠে গেয়েছিলেন ‘রহে না রহে হাম’–মমতা ছবির কালজয়ী সে গান। সুমন রাও হেমাদির জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে। বাবা শংকর রাও হেমাদি তখন উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায়। মাতা সীমা রাও হেমাদি। তাঁরা ছিলেন মরাঠি সারস্বত ব্রাহ্মণ। কর্ণাটক রাজ্যের ব্যাঙ্গালোরের উদুপি জেলার কুন্দপুর পরগনার হেমাদি গ্রামের অধিবাসী। মরাঠিদের অনেকে নাম পদবীর শেষে গ্রামের নামও উল্লেখ করে থাকেন। শংকর ও সীমা দম্পত্তির ৫ কন্যা ১ পুত্রের জ্যেষ্ঠতমা সুমন। ১৯৪৩ সালে রাও পরিবার মুম্বাইতে স্থিত হয়। সুমনের পড়াশোনাও বেড়ে ওঠা সেখানে। ১৯৫৮ সালে মুম্বাইয়ের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরের সঙ্গে সুমনের বিয়ে হয়। সুমন রাও হেমাদি থেকে হন সুমন কল্যানপুর। কল্যাণপুর পরিবার রক্ষণশীল হলেও সুমনের সংগীত চর্চায় বরং উৎসাহ দিয়ে গেছেন। রামানন্দ স্ত্রীকে সবসময় ছায়া দিয়ে গেছেন। নিজে নিয়ে যেতেন রেকর্ডিং এ দম্পতির একমাত্র সন্তান–কন্যা চারুলা বিবাহোত্তর জীবনে মার্কিন প্রবাসী। চারুলার পুত্র অগ্নিদেব ও কন্যা ঐশানী মাতামহীর উত্তরাধিকারে সংগীত চর্চায় নিয়োজিত। ২০০৯ সালের মহারাষ্ট্র সরকার সুমন কল্যাণপুরকে লতা মঙ্গেশকর পদকে ভূষিত করেন। জীবনের একেবারে প্রান্তসীমায় ২০২৩ সালের ২২ মার্চ ৮৬ বছর বয়সে সুমন ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ পদকে ভূষিত হন। নিভৃতচারিণী এই শিল্পী পরিশীলিত জীবন যাপনের শেষে ৮৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের আন্ধেরির লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সের নিজ বাসভবনে দেহান্তরিত হলেন।
শেষ করি শিরোনামে উল্লেখিত গানটির শেষ অস্থায়ীর অনুরণনে–
‘আমি চলে যাই–ডেকো না আমায়
আমিও আকাশ পাবো কোনও দিন
শেষ যার নেই কোনও।











