অভাবনীয় আড্ডা

রুমানা শফী | মঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

হাতে কিছু ফুল নিলাম। যাঁর কাছে যাচ্ছি তাঁকে দেয়ার এর চাইতে সুন্দর উপহার হয় না। রিক্সারোহী দু‘জন। আমি আর বড় বোন। ভীষণ আনন্দ মনে, কিছুটা শিহরিত। নতুন বই হাতে পাবো যাতে আছে আমার লেখা তাও আবার প্রিয় জনের কাছ থেকে। ভিতরে ঢুকতেই দেখি একজন আমাদের এগিয়ে নিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভিতরে গেলাম যথারীতি। সেই সৌম্য, সুন্দর, সজ্জন আমাদের অনেকেরই প্রিয় রাশেদ ভাই। হ্যাঁ, আমি লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক রাশেদ রউফ ভাইয়ের কথাই বলছি। যাঁকে এক নামেই সবাই চেনেন। একটু একটু ঘামছিলাম, ভেতরে ঢুকতেই এসি‘র বাতাস সহ বইয়ের নতুন গন্ধ অন্য রকমের সংযোজনা তৈরি করলো আর রাশেদ ভাইয়ের হাসি। আমিও মুখ ভরা হাসি নিয়ে ফুল তুলে দিলাম হাতে। আর আমিও মনে গভীরে তুলে নিলাম আরও অনেক লেখক, কবি, সম্পাদকের সান্নিধ্য।

পরিচয় পর্ব শেষ করে বললেন আসেন ছবি তুলবো। আমার হাতে তুলে দিলেন বিশাল শিশু সাহিত্য রাশেদ ভাইয়ের সম্পাদিত একটি বই যাতে আছে আমার লেখা। আমি আনন্দে আপ্লূত হয়ে যাই। এতো সম্মান, এতো প্রশংসা এই গুণী জন করছেন আমাকে নিয়ে! পাতা উল্টে সূচিপত্রে নিজের লেখার স্থানটা দেখে বেশ বুকটা ভরে উঠলো। আমার লেখা কেমন হয়েছিল তা আর মাথায় নেই, শুধু ভাবছিলাম এতো চমৎকার করে আমার লেখাটা উপস্থাপিত হলো? ভালো লাগায় লজ্জায় মাথা আরও নত হলো এই গুণী মানুষটার কাছে। তারপর শুরু হলো তুমুল আড্ডা। বড় আপা ( ফারজানা শফী) এতো পুরনো গল্প শুরু করলেন তাতে সকলে অবাক! সেই আমাদের ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের গল্প। সাথে বার বার বলছেন আপা, রুমানা তো তখন বেশ ছোট ওরা তখন কিচ্ছু বুঝতো না। সবাই ডুবে গেলাম আড্ডায়। এবার মনে হলো সকল জ্ঞানী মানুষগুলো আপার কথা গভীর ভাবে শুনছেন আর অবাক হচ্ছেন। সবাই লেখে না বা পারলেও জীবনে লেখার সময় করে উঠতে পারে না। রাশেদ ভাই সহ সবাই বললেন, আপা আপনি লিখেন, যা বলছেন এগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলীল, ইতিহাস! এর ভিতর নাস্তা এলো। কেক, পুরি, চা.. সাথে সকল লেখকের কাছ থেকে তাঁদের লেখা আরও বই দুজনেই পেলাম।

আড্ডার কিন্তু কমা দাড়ি ছিলো না। এই আড্ডা যে শৈলী‘র আড্ডা তা পরিপূর্ণ। হঠাৎ আমি ভয়ে ছোট্ট চিৎকার করে পা দুটো যেন চেয়ারে উঠিয়ে ফেললাম। কি হলো? বললাম ইঁদুর…সবাই হাসলেন, বললেন এমন যোদ্ধা নারীর মেয়ে ইঁদুর তেলে পোকা ভয় পায় নাকি! বললাম, আরে না না হঠাৎ এলো তো! আচ্ছা এখানে এত্তো সব বই তাও নতুন নতুন, ওরা কেটে ফেলবে না? রাশেদ ভাই অট্টহাসি দিয়ে বললেন, না ওরা একটা বইও কাটে না। ওরা আমাদের মতোই শৈলী‘র সদস্য। সবাই হেসে দিলাম। দেখলাম ঠিকই ওরা একটু আসে, আবারও ফিরে যায়। কেউ পায়ের কাছ ঘেঁষে পিছনে চলে যাচ্ছে। আমার গা শিউরে উঠছিলো। আপা বললেন, নেংটি ইঁদুর, কিসের ভয়? বললাম এতো বড়!

ফিরে ফিরে আড্ডায় যাচ্ছি আর চারিদিকে নজর রাখছি দুষ্টু গুলোর দিকে। এতো বড়ো বড়ো নেংটি ইঁদুর সচরাচর দেখা যায় না। শৈলীর আড্ডায় নাস্তা খায় আর লেখক কবি সাহিত্যিক সম্পাদক প্রকাশকদের পায়ের কাছে ঘুরে ঘুরে ওরাও আদর আহ্লাদ আর জ্ঞানের আলোচনা শুনে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠছে সাথে নিচ্ছে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নতুন বইয়ের গন্ধ। মনে হলো ওরাও তাই বইগুলোর যত্ন করে, কাটে না। খুব হিংসে হলো ওদের। মনে হলো ইঁদুরগুলোর মতো আমরাও রোজ এই শৈলী আড্ডায় আসতে পারতাম! দুই ব্যাগ ভরা বই, প্রশান্তির চমৎকার আড্ডা, নাস্তা, দুষ্টু কিন্তু বুঝদার ইঁদুর আর গুণীজনদের সান্নিধ্য শেষে দুই বোন মনের আনন্দে অন্য রকমের আমেজ নিয়ে ফিরে এলাম বাসায় আবারও যাবার আশায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউৎসব মানেই আনন্দ
পরবর্তী নিবন্ধবাস্তুচ্যুতি বাড়াচ্ছে নগরে কিশোর অপরাধ!