অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া

স্নেহাশিস বড়ুয়া | সোমবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, সংগঠক, সদ্ধর্ম প্রচারক, শান্তিদূত, বিশ্ব পরিব্রাজক, মানবতাবাদী, গবেষক, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, অনুবাদক, বহুগ্রন্থপ্রণেতা, সুবক্তা, সুলেখক। ১৯৪৫ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বিপ্লব তীর্থ রাউজান থানার আবুরখীলে এক অভিজাত পরিবারে তিনি জন্ম নেন। পিতা ছিলেন তৎকালীন সমাজপতি কৈলাস চন্দ্র বড়ুয়া, মাতা উপাসিকা মল্লিকা রাণী বড়ুয়া। ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া নামেই যার পরিচয়। নানা প্রতিভায় প্রতিভাদীপ্ত এ ক্ষণজন্মা ব্যক্তির কর্ম কৃতিত্বের কথা সেতো সফলতার এক মহাকাব্য। সে মহাকাব্যের হরফে হরফে, পাতায় পাতায় আমরা পাই জাতিকে উদ্ভাসিত করার নির্যাস, সমাজ বিনির্মাণের আলোকিত মূলমন্ত্র, শিক্ষাকে বিকশিত করার উদ্দীপনা। সমাজ গগনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলোকচ্ছটায় সমাজ খুঁজে পেয়েছে পথ নির্দেশনা।

. বড়ুয়ার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি ঘটে আবুরখীল অমিতাভ প্রাইমারী স্কুলে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত আবুরখীল অমিতাভ হাই স্কুলে অধ্যয়ন করে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।স্কুল প্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম ছাত্র হিসাবে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ম্যাট্রিকুলেশনের পর ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এইচএসসির পর ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অনার্সে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ২য় শ্রেণিতে ১০ম স্থান লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে ঢাবি হতে ১ম শ্রেণিতে ৩য় স্থান লাভ করে এমএসসি পাস করেন। শিক্ষা জীবন শেষে ড. বিকিরণ বড়ুয়া কর্মজীবন শুরু করেন কক্সবাজার কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে। ১৯৬৮ সালে যোগ দেন রাঙ্গুনিয়া কলেজে। রাঙ্গুনিয়া কলেজ হতে পিএসসির মাধ্যমে তিনি ১৯৬৯সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে যোগ দেন। সেখান থেকে প্রায় ৩ মাস পর বদলী হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১ঌ৮০ সালে পদোন্নতি হয়ে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হন। ১৯৮৩ সালে পুনরায় বদলী হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের ১৩ ই ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং ২০১১ সালের ৩০ শে জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরে যান। সরকারি কলেজে থাকাকালীন ১৯৮২সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। উল্লেখ্য বড়ুয়া বৌদ্ধদের মধ্যে বিজ্ঞানে তিনি প্রথম পিএইচডি ডিগ্রীধারী। শিক্ষক হিসেবেও তিনি দক্ষতা ও সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের রোল মডেল হলেন ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া। প্রবাদ প্রতীম এই শিক্ষক দেশের শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। উনার সমকালে বাংলাদেশে পদার্থবিদ্যার যে কজন শিক্ষক খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন তন্মধ্যে ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়ার নাম অগ্রগণ্য থাকবে। লেখক হিসেবেও ড. বড়ুয়া সফল ছিলেন। নানা পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, দেশীবিদেশী নানা জার্নালে উনার প্রচুর লেখা ছাপানো হয়েছে। উনার লেখা সমাজকে আলোকিত করেছে, পাঠককুলকে করেছে ঋদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বাংলাদেশের বিভিন্ন পদার্থবিদ্যা বিষয়ক জার্নালে তাঁর ১৭ টি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়। তিনি বেশ কিছু গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। তন্মধ্যে প্রিয়ানন্দ মহাজীবন, Atisa the Great , Buddhism & its thoughts বিজ্ঞানালো উল্লেখ্য।

কিংবদন্তিতুল্য এই সমাজসেবকের সমাজসেবার গুণকীর্তনের কথা বলতে গেলে সর্বাগ্রে আসে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের নাম। বহু নেতা সৃষ্টির উর্বরভূমি তথা এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অভিবৃদ্ধিতে মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের, অবিসংবাদিত বৌদ্ধ নেতা ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া, সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরর পাশাপাশি ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়ার নামও উচ্চারিত হবে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভিক্ষু ব্যক্তিত্ব বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরকে চেতনায় ধারণ করে বৌদ্ধদের কৃষ্টি, সভ্যতার বিকাশে ব্যাপক অবদান রেখে প্রচার সংঘের এই ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্মকে তিনি সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য করেছেন। বিশ্ব খ্যাত সাংঘিক ব্যক্তিত্ব বোধিসত্ত্ব বলে খ্যাত মাষ্টার শিন উইন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধজ্যোতি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আত্মপ্রকাশ উনার সাংগঠনিক কর্মকুশলতার অনবদ্য সংযোজন। আবুরখীল জনকল্যাণ সমিতি ও উনার সাংগঠনিক দক্ষতার অনন্য নজির।

. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া শুধু একটি নাম নয়, একটি অধ্যায়, একটি ইতিহাস। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উনার অবিনশ্বর কীর্তিগাথা জন মানবের কাছে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। সমাজে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নানা উপাধি, সম্মাননায় নিজকে ভূষিত করেছেন। যেসব উপাধি, সম্মাননায় তিনি নিজকে অলংকৃত করে জাতিকে ধন্য করেছেন তন্মধ্যে একুশে পদক, শেরে বাংলা পদক, বিশ্ব বৌদ্ধ মহারত্ন, চসিক কর্তৃক একুশে পদক, মাহাত্মা গান্ধী এ্যাওয়ার্ড, অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদক, মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল এ্যাওয়ার্ড, দি আউটস্ট্যান্ডিং ওয়ার্ল্ড বুড্ডিষ্ট লীডার এ্যাওয়ার্ড, আচার্য শিন উইন শান্তি পুরস্কার, চট্টগ্রাম বিজ্ঞান পরিষদ পুরস্কার, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ ফেডারেশন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সমাজকর্মী উপাধি উল্লেখ্য। ২০২৩ সালের ১৭ই আগস্ট বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের মহাসচিব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সমাজের গর্ব, চেতনার বাতিঘর ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া সবাইকে শোকের মহাসাগরে নিমজ্জিত করে অনন্ত ধামে গমন করেন। পরিশেষে এই মহান ব্যক্তিত্বের মহতী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ যে কোন পাবলিক ভার্সিটির বিশেষত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যতে নির্মিতব্য যে কোন ১টি হলের নাম ‘ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া হল’এ নামে নামকরণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

লেখক: প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব সংস্থা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধঅপরাধীর সংশোধনে প্রবেশন : মানবিক প্রয়াস বনাম বাস্তবতার সংকট