বাংলাদেশে বিচারিক ব্যবস্থায় ‘প্রবেশন’বা অপরাধীকে কারাদণ্ড না দিয়ে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি একটি অত্যন্ত মানবিক ও আধুনিক সংশোধনমূলক ধারণা। কারাগারে বন্দি করে অপরাধীকে শোধরানোর চেয়ে তাকে সমাজের মূলধারায় রেখে সংশোধনের সুযোগ করে দেয়াই এ প্রক্রিয়ার মূল দর্শন। বর্তমান বিশ্বে অপরাধ বিজ্ঞান ও আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় কারাদণ্ডের বিকল্প হিসেবে ‘প্রবেশন’ বা ‘কমিউনিটি কারেকশন’ ব্যবস্থাকে সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তাত্ত্বিক ভিত্তির দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই আইনটি সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাবে বাংলাদেশে আজও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি কেবল আইনি সীমাবদ্ধতা নয়, বরং প্রশাসনিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আইনি ভিত্তি ও প্রেক্ষাপট–বাংলাদেশে প্রবেশন কার্যক্রমের আইনি ভিত্তি অত্যন্ত সুসংহত। ১৯৬০ সালের ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স’ অনুযায়ী, আদালত প্রথমবার বা লঘু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কারাগারে না পাঠিয়ে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখার ক্ষমতা রাখে। এই অধ্যাদেশের ধারা ৪ অনুযায়ী আদালত অপরাধীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবেশন আদেশ দিতে পারে এবং ধারা ৫ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু শর্ত যেমন নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা ও নিয়মিত প্রবেশন অফিসারের কাছে রিপোর্ট করার নির্দেশনা দিতে পারে। ধারা ৬–এ প্রবেশন আদেশ ভঙের শাস্তির বিধানও রয়েছে। অন্যদিকে, শিশু আইন, ২০১৩–এর ধারা ৩৪–এ শিশু অপরাধীদের সংশোধনের ক্ষেত্রেও একই রূপরেখা রয়েছে। আইনের এই ধারাগুলো মূলত অপরাধীকে কারাগারের অন্ধকার পরিবেশ থেকে দূরে রেখে সংশোধনমূলক পরিবেশে রাখার সুযোগ দেয়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, আইনি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশন আদেশের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে কম। অনেক বিচারক আজও প্রথাগত কারাদণ্ডকেই অপরাধের একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি হিসেবে মনে করেন, ফলে প্রবেশন ব্যবস্থা কারাগারের অতিরিক্ত চাপের বিপরীতে এক কার্যকর বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জনসচেতনতার সংকট–এই ব্যবস্থার সফলতার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো জনসচেতনতার অভাব। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবেশন নিয়ে গভীর ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সমাজ এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রবেশনকে অপরাধীর প্রতি ‘অতিরিক্ত সহানুভূতি’ বা ‘শাস্তি থেকে মুক্তি’ হিসেবে দেখেন। জনমানসে এক বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, অপরাধের একমাত্র প্রতিদান হলো কারাগার বা কারাদণ্ড। এই নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রবেশনে থাকা ব্যক্তিরা সমাজে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারেন না; উল্টো তারা সামাজিক বর্জনের শিকার হন। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের পক্ষ থেকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে যে অপরাধীকে সংশোধনের জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সামাজিক কলঙ্ক তাকে পুনরায় অপরাধ জগতে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। সমাজ মনে করে, প্রবেশন মানে অপরাধীকে দায়মুক্তি দেওয়া কিন্তু তারা এটা বোঝেন না যে, কারাগার অপরাধীদের পেশাদার অপরাধী হিসেবে গড়ে তোলার কারখানা হতে পারে, অন্যদিকে প্রবেশন তাদের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতার ঘাটতি– প্রশাসনিক অবকাঠামোর দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে থাকা প্রবেশন কর্মকর্তাদের ওপর কাজের চাপ অকল্পনীয়। একজন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে অসংখ্য প্রবেশনারের তদারকি করতে হয়, যা কোনোভাবেই কার্যকর পর্যবেক্ষণ বা মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য সহায়ক নয়। উন্নত বিশ্বের ন্যায় যেখানে একজন প্রবেশন অফিসার সীমিত সংখ্যক মানুষের নিবিড় তত্ত্বাবধানে কাজ করতে পারেন, সেখানে বাংলাদেশে সেই সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাব।
আধুনিক প্রবেশন ব্যবস্থায় কেবল প্রশাসনিক নজরদারি যথেষ্ট নয়; বরং কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং, পুনর্বাসন কৌশল, মাদক নিরাময় প্রোগ্রাম এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল বিষয়গুলোতে পারদর্শী হতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বাজেট বরাদ্দের অভাবে তারা কেবল ফাইলবন্দি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতেই সীমাবদ্ধ থাকছেন। কর্মকর্তাদের পদসংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত, যার ফলে প্রতিটি জেলায় বা থানায় কার্যকরভাবে প্রবেশন কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পুনর্বাসনের অভাব: একটি বড় চ্যালেঞ্জ– আর্থ সামাজিক পুনর্বাসনের অভাব প্রবেশন ব্যবস্থাকে কেবল একটি আইনি কাগজে পরিণত করেছে। কারাদণ্ড না দেওয়া মানেই কাজ শেষ নয়, বরং তার পরে শুরু হয় আসল চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন। প্রবেশনে থাকা ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট সুযোগ না থাকায় তারা অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ে। প্রবেশনার যখন সমাজে ফিরে আসে, তখন সে নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। কিন্তু তার যদি নিয়মিত আয় বা কাজের সুযোগ না থাকে, তবে সে আবারও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। সমাজসেবা অধিদপ্তর বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন, কারাগার অপরাধীদের অপরাধীই তৈরি করে, আর প্রবেশন তাদের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, জনসচেতনতার অভাব ও কর্মকর্তা সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রবেশন কার্যকর হচ্ছে না। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ল’ কমিশন ২০১৯–এর প্রতিবেদনেও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও আদালতের প্রবেশন আদেশ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়–আন্তর্জাতিকভাবে United Nation Office on Drugs and Crime (UNODC) তাদের প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, প্রবেশন ব্যবস্থা কেবল কারাগারের চাপই কমায় না, বরং অপরাধীদের সমাজে পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে কেবল আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমত, বিচারকদের প্রবেশন আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে আরও উৎসাহিত ও সচেতন করতে হবে। আইনবিদ ও বিচারকদের নিয়মিত ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রবেশনের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি জেলায় প্রবেশন কর্মকর্তার পদসংখ্যা বাড়িয়ে তাদের ওপর থেকে কাজের চাপ কমাতে হবে এবং আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে প্রবেশন কোনো সহানুভূতি নয়, বরং সমাজকে অপরাধমুক্ত করার একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
বাজেট বরাদ্দ ও সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা–সবশেষে, প্রবেশন কার্যক্রমকে সফল করতে হলে বাজেট বরাদ্দে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। কারাগারের অবকাঠামো ও পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র বিশাল বাজেট বরাদ্দ দেয়, কিন্তু প্রবেশন কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন নগণ্য। এই বাজেট দিয়েই অপরাধীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র, কাউন্সেলিং সেবা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে, কারাগার ব্যবস্থাপনার ব্যয় অনেক বেশি, তুলনায় প্রবেশন ব্যবস্থাপনার ব্যয় অনেক কম এবং তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য লাভজনক। মনে রাখতে হবে, অপরাধীকে নয় বরং অপরাধকে ঘৃণা করাই সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য। কারাগারের চার দেয়াল মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, আর প্রবেশন তাকে মানুষ হওয়ার দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। প্রবেশনকে কেবল আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একটি মানবিক ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে।
লেখক: আইনবিদ, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।











