ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফমের্র কারণে বিশ্বজুড়ে অনলাইনে কেনাকাটা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই খাতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাবও বাড়ছে হু হু করে। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন, বৈশ্বিক অনলাইন খুচরা বাণিজ্যের প্রধান পথ প্রদর্শক হিসেবে বলা হয়ে থাকে অ্যামাজনকে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের কার্যক্রম বর্তমানে ২২টি দেশে বিস্তৃত এবং তাদের বাজার মূলধন প্রায় ২ হাজার ১৩১ বিলিয়ন ডলার, বিশস্ততা ও গ্রাহক সন্তুষ্টিতে এটি বিশ্বে অনন্য একটি প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিককালে চীনের প্রতিষ্ঠান আলিবাবাও বিশ্বে অনলাইন ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের অন্যতম এই বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান, যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বস্ততার সাথে লাখ লাখ ছোট ও বড় ব্যবসাকে সংযুক্ত করেছে। আলিবাবার বাজার বর্তমান মূলধন প্রায় ৩১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বের প্রায় ২০০টির বেশি দেশে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশে ই–কমার্স বা অনলাইন ব্যবসার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের দিকে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকলেও এসময়ে ‘মুন্সিজি ডট কম’ (Munshigi.com) নামের একটি ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে দেশে অনলাইনে কেনাকাটা বা ই–কমার্সের সূচনা হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইনে লেনদেনের অনুমোদন দিলে বাংলাদেশেও অনলাইন বিজনেসের বৈধতা লাভ করে এবং ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ই–কমার্স আইন চালু হয়। ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে এবং জনপ্রিয় বেশ কিছু ই–কমার্স প্ল্যাটফর্ম বাজারে আসার পর বাংলাদেশে ই–কমার্স ব্যবসা জনপ্রিয় হতে থাকে। ২০২০ করোনা মহামারীর সময় সাধারণ মানুষের কাছে অনলাইন শপিং একটি অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং বর্তমানে বাংলাদেশে এটি বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী শিল্পে রূপ নিয়েছে। এই সময়ে আজকের ডিল, এখনি ডট কম, দারাজ, বিক্রয় ডট কম, আড়ং, পিকাবু, রকমারি, চালডাল, আরোগ্য এবং স্টারটেক এর মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে অনলাইনে ব্যবসা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে মানুষের হাতে হাতে এখন এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন থাকায় বাংলাদেশি ই–কমার্স ওয়েবসাইটগুলোর ব্যবসা শুধু শহরের নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী যে কোন একটি ব্যবসা শুরু হলে তা ব্যাঙের ছাতার মত চারিদিকে গজিয়ে উঠে ফলে এতে কিছু অসাধু এবং প্রতারক চক্র তৈরী হয় যারা মূল ব্যবসায়ীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যারা খুব কম সময়ে বাজার থেকে লভ্যাংশ নিয়ে সটকে পড়ে, ফলে ক্রেতাদের মধ্যে সেটি নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরী হয়। পৃথিবীতে ই–কমার্স প্রসার লাভ করলেও বাংলাদেশের ই–কমার্স বা অনলাইন বিজনেসের প্রতি অনেক গ্রাহক আস্থাহীনতায় ভুগছে। কারণ ই–কমার্স ব্যবসার নামে অনেকেই গ্রাহককে প্রতারিত করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ডিজিটাল প্লাটফরম বা ই–কমার্স ব্যবসায়ও একটি প্রতারক চক্রের সিন্ডিকেট তৈরী হয়েছে। যারা প্রকাশিত ছবির সাথে পণ্যের মিল না রেখেই পণ্য সরবরাহ করে, কেউ আবার অগ্রীম অর্থ গ্রহণ করার পর আর গ্রাহকের সাথে কোন যোগাযোগই রক্ষা করেন না। স্বল্প পুঁজিতে অধিক লাভের আশায় আইনের তোয়াক্কা না করে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত না হয়েও এখন বাংলাদেশে প্রচুর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনলাইন ব্যবসায় নেমে পড়েছে। যাদের কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকেনা তার শুধু সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের পণ্য ক্রয় বিক্রয় করে। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালে ই–কমার্স পরিচালনার বিষয়ে ডিজিটাল ই–কমার্স নির্দেশিকা অনুমোদন করে এর অন্যতম কারণ ডিজিটাল ব্যবসা প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে ই–কমার্স প্রসারের কারণে যেমন বেকারত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে তেমনি স্বল্প পুঁজির কিছু উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবে ই–কমার্সের জনপ্রিয়তার কারণে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সৃষ্টি হয়েছে যারা তাদের পেইজে প্রদর্শিত দ্রব্যের সাথে সরবারহকৃত দ্রব্যের মিল পাওয়া যায় না। যারা নিম্ন মানের পণ্য সরবরাহ করে মুনাফা অর্জন করে। অনেকেই আবার অর এর মাধ্যমে প্রকৃত ছবির বা পণ্যের বিভিন্ন পরিবর্তন সাধন করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য, কিন্তু এতে গ্রাহক প্রতারিত হন, অনেকেই আবার অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলে অথবা নতুন নামে ব্যবসা শুরু করেন। অত্যাধিক লাভের আশায় অনেকেই অনলাইন ব্যবসায় এই অপকর্ম করছে। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশে ই–কমার্স বিষয়ে নির্দেশিকা থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ নেই বা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। দেশের সকল প্রচলিত আইনও কিন্তু আইন ই–কমার্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ই–কমার্স আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ডিজিটাল ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনয়নের মাধ্যমে ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধি এবং অধিকার নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা কিন্তু ভোক্তা অধিকার দপ্তর এই বিষয়ে খুব একটা কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ই–কমার্স আইনে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিবরণী উল্লেখ করার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান সেটি মানেন না। সকল ডিজিটাল ই–কমার্স পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইন্সেস, ভ্যাট নিবন্ধন, TIN, ইউনিক বিজনেস আইডেনটিটি ফিকেশান নাম্বার (UBID) বা পারসোনাল রিটিইল এ্যাকাউন্ট (PRA) নম্বর গ্রহণ এবং তা সোস্যাল মিডিয়ার পেইজে প্রচার করার কথা থাকলেও অনেকেই সেটি করেন না। অনেকের আবার নির্দিষ্ট কোন ঠিকানাও ব্যবহার করেন না। ডিজিটাল ই–কমার্স আইনে স্বচ্ছতার জন্য ব্যবসার সকল লেনদেন ৬ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের অল্প কিছুদিন পরেই হদিস পাওয়া যায় না। পণ্যের ক্ষেত্রে পণ্যে বিস্তারিত বিবরণের (ব্র্যান্ড, মডেল, তৈরীকৃত দেশের নাম) উল্লেখ করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটি পালন করা হয় না। কোন নকল বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নকল পণ্য গ্রাহককে সরবরাহ করা হয়।
আপাতদৃষ্টিতে অনলাইন ব্যবসার প্রসার হলেও সেটি প্রকৃত ব্যবসায়ীর জন্য হুমকি স্বরূপ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এবং বেকার সংকট দূরীকরণে ই–কমার্স এর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা থাকলেও যদি এর সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে সেটি হয়তো বাংলাদেশের ই–কমার্স ব্যবসায় আস্থাহীনতা ও সংকট তৈরী করবে। বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার আইনে নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও ভোক্তা অধিকার দপ্তর প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। ই–কমার্স ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা না থাকলেও স্মরণকালে বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার নামে একটি গোষ্ঠী অধিক মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এর অন্যতম কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকীর অভাব। তাই নিরাপদে অনলাইন শপিং করার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ এবং অনলাইন কেনাকাটার জন্য বিশ্বাসযোগ্য ও জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয়–বিক্রয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আগামীদিনে বাংলাদেশে ই–কমার্স বা অনলাইন ব্যবসা প্রসার ও গুণগত মান রক্ষা করার জন্য এখনই এর আইনের মাধ্যমে সঠিক নিয়ন্ত্রণ দরকার।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্টার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।











