অধ্যাপক ডা. এল এ কাদেরী : মেধা ও প্রতিভার এক অনন্য সমন্বয়

ডা. এম এ মান্নান | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক ডা. এল এ কাদেরী ছিলেন মেধা, প্রতিভা, মানবিকতা ও উদারতার এক অনন্য সমন্বয়। তাঁর অসাধারণ জীবন ও কর্মের কথা স্মরণ করলে একই সঙ্গে বিস্ময়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মন ভরে ওঠে।

১৯৫৯৬০ সালে অধ্যাপক ডা. এল এ কাদেরী যখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র, আমার মেডিকেল কলেজজীবন শুরু হয় ১৯৬৩৬৪ সালে। অর্থাৎ তিনি যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, আমি তখন প্রথম বর্ষের। সেই সময়ে মেডিকেল কলেজে এক বছরের সিনিয়রজুনিয়রের মধ্যেও যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলার একটি সংস্কৃতি ছিল। সে সময় মেডিকেল কলেজে দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদেরই অধিকাংশ ভর্তি হতেন। তাঁদের মধ্যেও এল এ কাদেরী সাহেবের নাম বিশেষভাবে উজ্জ্বল ছিল।

ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের কথা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের রেকর্ড ভেঙে ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেনএটি ছিল তাঁর অসাধারণ মেধার এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি।

আমরা তখন ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক আকরাম হোসেন স্যারের ওয়ার্ডে কাজ করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, একটি ফোন পেয়ে তিনি আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘এহে, নতুন ডাক্তাররা, শোনোআমার প্রিয় ছাত্র ডাক্তার লুতফুল আনোয়ার কাদেরী লন্ডনের রয়্যাল কলেজের এফআরসিএস পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হয়ে বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছে।’ তাঁর সেই আনন্দ ও গর্বের মুহূর্তটি আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান।

পরবর্তীতে অধ্যাপক ডা. এল এ কাদেরী বাংলাদেশে দ্বিতীয় এবং চট্টগ্রামের প্রথম নিউরোসার্জন হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। তাঁর মেধা, দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠা ছিল অন্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র। তাঁর তত্ত্বাবধান, নিরলস পরিশ্রম ও দূরদর্শিতায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগ ধীরে ধীরে পথচলা শুরু করে এবং আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসজ্জিত নিউরোসার্জারি বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিউরোসার্জন হিসেবে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা ও হাতেকলমে চিকিৎসানৈপুণ্য সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে নয়, রোগী, রোগীর স্বজন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর অসাধারণ মানবিক ও আন্তরিক আচরণ তাঁকে একজন অনুকরণীয় চিকিৎসকে পরিণত করেছিল। চিকিৎসক হিসেবে আগামী প্রজন্মের জন্য তাঁর এই মানবিকতা ও রোগীবান্ধব আচরণ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ডা. এল এ কাদেরী ছিলেন উদারতা, মানবিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের এক অনন্য সম্মিলন। একদিকে তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান একজন চিকিৎসক, অন্যদিকে ছিলেন অত্যন্ত বড় মনের একজন মানুষ। পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং কর্মজীবনসব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল ও সম্মানিত।

আমার কাছে ডা. এল এ কাদেরী কেবল একজন বড় ভাই বা আত্মীয় ছিলেন না, তিনি ছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আমার জীবনের চলার পথে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, একজন দিকনির্দেশক। আমার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে তাঁর পরামর্শ, স্নেহ ও উৎসাহ আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তিনি আমাকে যে সম্মান, ভালোবাসা ও স্নেহের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, তা কোনোদিন ভোলার নয়।

ডা. এল এ কাদেরীর এই অসাধারণ জীবন, তাঁর প্রতিভা, কর্মসাফল্য এবং মানুষের কাছ থেকে অর্জিত গভীর সম্মানসবই সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য দান। আমাদের প্রিয় ঝুন্টুদা তাঁর অসাধারণ কর্ম ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছেন, তা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় ঝুন্টুদাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। তাঁর স্মৃতি, তাঁর মানবিকতা ও তাঁর কর্ম আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকুক।

লেখক : ডা. এম এ মান্নান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রেরণার উৎস : প্রফেসর ডা. এল এ কাদেরী