(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বন্ধুসহ হংকংয়ের ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। অস্টিন এমআরটি স্টেশন। স্টেশনটি মাটির বেশ গভীরে। লম্বা সিঁড়ি ভেঙ্গে আসতে হয়েছে। গভীর রাত হলেও অনেক যাত্রী। নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে সকলে অপেক্ষা করছেন। ডিজিটাল বোর্ডে ট্রেনের গন্তব্য ও সময় দেখানো হচ্ছে। ঠিক তিন মিনিটের মাথায় আমার ট্রেন চলে আসলো। স্বপন কোলাকুলি করে আমাকে ট্রেনে তুলে দিলো।
ট্রেন চলতে শুরু করে। জানালার ওপারে প্রথমে চোখে পড়ে হংকংয়ের ঘনবসতিপূর্ণ নগরজীবন। একের পর এক স্টেশন পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলো রাতের ট্রেন। কোথাও ঝলমলে আলোকিত আবাসিক ভবন, কোথাও অন্ধকারে ডুবে থাকা শহরের অংশবিশেষ। ভূগর্ভস্থ পথ পেরিয়ে ট্রেন যখন উন্মুক্ত রেলপথে এগিয়ে যায়, তখন রাতের হংকং যেনো ঝলমল করে ওঠে।
দূরে সারি সারি উঁচু ভবনের জানালায় জ্বলছে আলো। কোথাও সড়কের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি, কোথাও আবার আবাসিক এলাকার নীরবতা। ট্রেনের ভেতরে কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, কেউ কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনছেন, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। হংকংয়ের রেলব্যবস্থার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো এর পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা। রাত হলেও যাত্রীদের চলাচলে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। প্রতিটি স্টেশনে থেমে আবার ছুটে চলেছে ট্রেন। শহরের ব্যস্ত কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে দূরের আবাসিক এলাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
পথে একটি ট্রেন পাল্টে আমি ঠিকঠাকভাবে নতুন ট্রেনে উঠি। একই ধরনের ট্রেন, একই ধরনের আয়োজন। যাত্রীরাও মনে হয় একই ধরনের। ভদ্র, সভ্য। কোন শব্দ নেই, কোন বিশৃংখলা নেই। নেই কোন হুড়োহুড়ি। অথচ ভারতে রাতের একটি ট্রেন জার্নির ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা মনে আছে। আমি যে বগিতে ছিলাম সেখানে কয়েকজন মাতালের উৎপাত মাথা গরম করে দিচ্ছিলো। খুবই আশ্চর্যের বিষয় ছিল তারা ট্রেনেই প্রকাশ্যে বোতল সাবাড় করছিল আর হুল্লোড় করছিলো। আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও এক ট্রেন জার্নিতে বগির ভিতরে একদল কিশোরকে মদ এবং গাঁজা খেতে দেখেছিলাম। তারা নিজেরা নিজেরা শুধু ধাক্কাধাক্কিই নয়, মারামারিও করছিলো। কিন্তু হংকংয়ের এমআরটিতে এমন কোন দৃশ্য না দেখে আমার খুবই ভালো লাগলো।
নির্দিষ্ট সময়ে আমি কাম শিয়ং রোড স্টেশনে পৌঁছালাম। রাত অনেক। স্টেশন থেকে বেরুতে গিয়ে মনে হলো অল্পক্ষণের ব্যবধানে যেন অন্য এক হংকংয়ে এসে পৌঁছেছি। টেম্পল স্ট্রিটের ঝলমলে আলো, মানুষের ভিড় আর বাজারের কোলাহলের কিছুই এখানে নেই। শান্ত ছিমছাম পরিবেশ। স্টেশন থেকে বেরুতেই এক ঝলক বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেলো। মনে হলো, শরীর মন সবই প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিলো।
কিন্তু একইসাথে ভয়ও লাগলো। স্টেশনের বাইরে জনমানব নেই। বাসস্টপেজে কোন প্যাসেঞ্জার নেই। একা আমিই দাঁড়িয়ে আছি। কোন ছিনতাইকারী এসে ঝাপ্টা মারবে কিনা ভয় লাগছিলো।
শাহীন ভাবীকে ফোন করলাম। জনমানবশূন্য স্টেশনের কথা বলে কি করা উচিত জানতে চাইলাম। ভাবী বললেন, কেউ থাকুক বা না থাকুন, আপনি শতভাগ নিরাপদ। কেউ আপনাকে কোথায় যাচ্ছেন তাও জিজ্ঞেস করবে না। এটি হংকং এখানে ছিনতাই হয়না। ভাবী পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফেরার বাস পেয়ে যাবো বলে জানালেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবাসিক এলাকার বাস এসে গেলো। তিনজন নারী পুরুষ নামলেন, কিন্তু ফেরার কেউ নেই। বিকেলে বাসা থেকে বেরোনোর সময় ভাবী আমাকে আসা–যাওয়ার জন্য দুইটি টিকেট দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি ফেরার টিকেটটি বাসের নির্দিষ্ট বাক্সে ফেলে অনেকটা বাদশাহর মতো পুরো বাস নিয়ে রওয়ানা হলাম। অনেকটা চেনা পথ, চেনা দৃশ্য। আগের বারও এই রাস্তা ধরে অন্তত শতবার চলাচল করেছি, এবারও করছি। মিনিট কয়েকের মধ্যে আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট স্টেশনে আমাকে নামিয়ে দেয়া হলো। আমি চেনাপথ ধরে বাসার কলবেল চাপলাম।
ভাবী বাচ্চাদের নিয়ে টিভি দেখছিলেন। বাংলাদেশি চ্যানেল, টক শো চলছিলো। আমিও সোফায় বসে পড়লাম। ভাবী ডিনার করেছি কিনা নিশ্চিত হলেন। চা বানাতে বললেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা টক শোর জের ধরে দেশের অবস্থা নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। পরে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারবো না। টেম্পল স্ট্রিট মার্কেটসহ বিকেলের প্রচুর হাঁটাহাঁটির প্রভাব পড়েছে। এক ঘুমেই সকাল হয়ে গেলো। জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো বলছিলো, বেশ বেলা হয়েছে। আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসলাম। আমাকে রেখে ভাবী এবং বাচ্চারা নাস্তা করেন না। তাই বেলা করে ঘুম থেকে উঠায় কিছুটা লজ্জাও লাগছিলো। কাঠের ঘোরানো সিঁড়িতে শব্দ করে করে নিচে নেমে আসলাম। ভাবী ঘুম কেমন হয়েছে জানতে চাইলেন। এতো বেলা করে ওঠাতেই ভাবীর প্রশ্নের উত্তর ছিল। টেবিলে নাস্তা লাগানো হলো। দেশিয় স্টাইলের মাংস, ডিম, সবজির সাথে পরোটা আর রুটি। অবশ্য টেবিলে ব্রেড এবং বাটারও ছিলো।
ভাবী আজকের প্রোগ্রাম কি জানতে চাইলেন। বললেন, আমার সাথে অফিসে যেতে পারেন, রেস্টও নিতে পারেন। দেখতে দেখতে আমার হংকং সফরের সময় পুরিয়ে আসলো। অস্ট্রেলিয়া এবং হংকং মিলে প্রায় একমাসের লম্বা সময়। অফিস এবং পরিবার পরিজন থেকে দূরে। তাই ফেরার দিন যতই ঘনিয়ে আসছিলো ততই ভালো লাগছিলো। একইসাথে ফেরার আগে যতটুকু সম্ভব দেখে যাওয়া ভালো। তাই ভাবীর সাথে অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবী অফিস করবেন, আমি আশাপাশে ঘুরবো। ফেরার সময় আবার ভাবীর সাথে চলে আসবো।
অবশ্য স্বপনকেও ডেকে নেয়া যায়। হংকংয়ের একেবারে সীমান্ত এলাকায় আমার একজন বন্ধু থাকেন। ফেসবুকে আমার হংকংয়ের ছবি দেখে তিনি ইতোমধ্যে কয়েকবার ফোন করেছেন তার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এতো দূরে যে একা একা যাওয়ার সাহস করতে পারিনি। স্বপন রাজি হলে তাকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারবো।
ভাবীর সমস্যা ড্রাইভার নেই। দেশ থেকে একজন ড্রাইভার নিয়ে গেলেও তিনি হংকংয়ের ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। আবার পথঘাটও চিনেন না। ফলে ওই ড্রাইভারকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো এবং বেতন দেয়া ছাড়া ভাবীর আর কোন কাজে লাগে না। আমার বন্ধুর বড় মেয়ে উরবানাই টুকটাক গাড়ি চালায়। মাকে নিয়ে অফিসে যায়, আনে।
আমি তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসলাম। ভাবীও তৈরি। বোরকা এবং হিজাব পড়ে গাড়িতে বসলেন, স্টিয়ারিংয়ে উরবানা।
চেনা পথ ধরেই এগিয়ে চললো আমাদের গাড়ি। বাস স্টপেজ পর্যন্ত রাস্তা চিনলাম, বাঁকগুলোও। কিছুদূর এগুনোর পর হংকং শহরের শহুরে দৃশ্য চোখে পড়তে লাগলো। রাস্তায় শত শত গাড়ি। দ্রুত গতিতে চলছে অসংখ্য গাড়ি। কিন্তু তেমন কোন শব্দদূষণ নেই। বেশিরভাগ গাড়িই নতুন, চকচকে। কোন শব্দ নেই, হর্ণতো দেয়ই না। রাস্তায় চলার এমন আনন্দ আমাদের দেশে কোনদিনই পাইনি, আমি নিশ্চিত যে পাবোও না।
উরবানা দারুণ গাড়ি চালায়, নিজের লেনে থেকে সে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কেন যে, মেয়েটির ড্রাইভিং লাইসেন্স এখনো পুর্ণ হলো না কে জানে। তাকে গাড়িতে লার্ণারের সাইন লাগিয়ে চালাতে হয়। অবশ্য, আর মাত্র একটি ধাপ পার হলেই সে হংকংয়ের রাস্তায় দাবড়িয়ে গাড়ি চালাতে পারবে।
আমরা অফিসে পৌঁছে গেলাম। টিপু ভাই অফিসেই ছিলেন, ছিলেন অন্যান্য স্টাফও। টিপু ভাই নিজেই আমার জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসলেন। টিপু ভাই আমার বন্ধুর ভায়রা ভাই। আমার বন্ধু ইউছুপ আলী ভাই জীবিত থাকাকালে টিপু ভাই আমাকে যেভাবে সম্মান করতেন, এবার আমার বন্ধু না থাকলেও একইভাবে সমাদর করেছেন। পুরো একদিন আমাকে নিয়ে ঘুরেছেন, নানাকিছু খাইয়েছেন।
ভাবী অফিসের কাজ করছিলেন, উরবানাকে নানাকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি নিচ থেকে ঘুরে আসি বলে অফিস থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়ালাম। কোনদিকে যাওয়া যায় চিন্তা করতে করতে আমার হংকং প্রবাসী বন্ধু খায়রুল ইসলাম নিজামী স্বপনকে ফোন করলাম। সে একটু ব্যস্ত বলে উল্লেখ করে বললো, পাঁচটা মিনিট সময় দে, কল করছি।
আমি কোনদিকে হাঁটতে শুরু করবো ভাবতে ভাবতেই স্বপন ফোন করলো। বললো, একজন বিদেশী বায়ার ছিল। তার সাথে কাজটি শেষ করলাম। কোথায় আছিস? আমি ইউছুপ আলী ভাইয়ের অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার কথা জানিয়ে আমার সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বন্ধুর নাম উল্লেখ করে বললাম, ওনি বারবার ফোন দিচ্ছেন, চল দেখে আসি।
স্বপন বললো, অনেক দূর, যাবি? (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।










