চট্টগ্রাম নগরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের চাপ। বিভিন্ন কারণে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে আসা মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর দেশব্যাপী প্রথম সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ৪৯ দশমিক ৬ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১২ লাখ মানুষ চট্টগ্রামে অবস্থান করছে। এদের অধিকাংশের বসবাস নগরীর আকবরশাহ, পাহাড়তলী, ঝাউতলা, বায়েজিদ, আরেফিন নগর, বাকলিয়া, বড়পোল, বন্দর, কাঠগড় ও স্টিল মিল–সংলগ্ন বিভিন্ন কলোনিতে। এসব এলাকায় আগে থেকেই তাদের আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজনেরা বসবাস করে আসছেন। এসব পরিবারের বেড়ে ওঠা কিশোরদের অনেকেই যথাযথ পরিচর্যা ও সামাজিক তদারকির অভাবে বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এবং মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তাদের অনেকে অটোরিকশা চালাচ্ছে। বেপরোয়া গতি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে প্রায়ই ঘটছে অটোরিকশাজনিত দুর্ঘটনা। এতে প্রকৃত অভিজ্ঞ চালকেরাও ঢালাওভাবে দোষারোপের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে স্থানীয় ‘বড় ভাইদের‘ মাধ্যমে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। সামপ্রতিক অপরাধের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন পাড়া–মহল্লায় জুয়া ও মাদকের আসর, চুরি, ছিনতাই, ত্রাস ও ভীতি সৃষ্টি, মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন কলোনিতে বসবাসকারী উচ্ছৃঙ্খল কিশোর।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা মানুষেরা ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আশ্রয় নিচ্ছে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন অলিগলি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) এবং অভিবাসন খাতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (রামরু)-এর পৃথক সামপ্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শহরে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি দারিদ্র্য, জমি হারানো, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ বাসস্থানের অভাব তাদের শহরমুখী করছে। কিন্তু দারিদ্র্য, অনিরাপদ বসতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অপতৎপরতা, সামাজিক সুরক্ষার অভাব ও দুর্যোগজনিত জীবিকা–সংকট সব মিলিয়ে এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর কিশোরদের অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
ফলে শহরে এসে এই বাড়তি জনগোষ্ঠী একদিকে যেমন নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচলে ভীতি সৃষ্টি করছে। এতে নগরজুড়ে কিশোর অপরাধের পুনরাবৃত্তিও ঘটছে।
বাস্তুচ্যুতির কারণে স্থানান্তরিত মানুষদের সুষ্ঠু নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা জরুরি। যেহেতু তারা নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছে, তাই নগরের অধিবাসী হিসেবে তাদের জন্য পর্যায়ক্রমে নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা গেলে তাদের ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। ইপসা পরিচালিত গবেষণাপত্রের আলোকে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষকে ত্রাণগ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও নগর উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়ে তাদের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং ও স্থানীয় এলাকাভিত্তিক মহল্লা কমিটির মাধ্যমে কলোনিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক












