ভাষা সৃষ্টির রহস্য

রিটন কুমার বড়ুয়া | সোমবার , ২ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর অপরাপর প্রাণীর পার্থক্য সম্ভবত ভাষা নিয়ে। কারণ, মানুষ ভাষার মাধ্যমে একজনের সঙ্গে অন্যজন ভাবের আদান–প্রদান করে থাকে। তাই বলে ইতর প্রাণীর ভাষা যে নেই, তা নয় ইতর প্রাণীরাও তাদের ভাবের আদান–প্রদানের জন্য ভাষা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু তাদের ভাষা প্রায়ই অস্পষ্ট ধ্বনিসমষ্টি; মানুষের ভাষা অস্পষ্ট ধ্বনিসমষ্টি নয়।

ভাষা মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সংস্কৃতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। ভাষার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা করে, জ্ঞান অর্জন করে, সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেয়। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ধ্বনি, শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ভাষাবিদদের মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। তবে সব ভাষার ব্যবহার সমান নয়। কিছু ভাষা কোটি মানুষের মাতৃভাষা, আবার অনেক ভাষা মাত্র কয়েকশ বা কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভাষাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। কোনো ভাষা বিলুপ্ত হলে সেই ভাষার সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়। বিশ্বের বহু আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মাতৃভাষার পরিবর্তে বড় ভাষাগুলো ব্যবহার করছে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও নানান সুবিধা লাভের আশায়; ফলে নিজের মাতৃভাষার প্রতি এ প্রজন্ম উদাসীন হয়ে পড়ছে। ভাষা রক্ষার জন্য প্রয়োজন মাতৃভাষায় শিক্ষা, অভিধান প্রণয়ন, সাহিত্য সৃষ্টি, গবেষণা এবং ডিজিটাল সংরক্ষণ।

আমাদের মনে সাধারণত প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে এত ভাষার সৃষ্টি হলো কীভাবে? আদিম যুগে মানুষের যখন মানসিক উৎকর্ষ লাভ হয়নি, তখন তার চিন্তাশক্তিরও বিকাশ হয়নি। সে সময় মানুষের ভাষা ও ইতর প্রাণীর ইঙ্গিতময় ধ্বনির মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য সম্ভবত ছিল না। প্রাথমিক স্তরে মানুষ ইঙ্গিত ও সংকেতের সাহায্যে ভাববিনিময় করলেও সেই সঙ্গে যেসব অস্ফুট ধ্বনি করত, সেগুলিই কালক্রমে বস্তু, ব্যক্তি এবং ভাববিশেষের শব্দপ্রতীকরূপে ভাষা হয়ে উঠল। একই বস্তু, ব্যক্তি কিংবা ভাব বোঝাতে একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ বহুজন দ্বারা স্বেচ্ছাকৃতভাবে বহুবার উচ্চারিত হওয়ার ফলে বস্তুনাম, ব্যক্তিনাম এবং ভাবদ্যোতক শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে মানবভাষার সৃষ্টি বলা যেতে পারে।

ভাষা বহতা নদীর মতো গতিশীল। এর পরিবর্তন বা বিবর্তন চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ভাষা ও নদী সমধর্মী। কোন অতীতে, কোন সুদূরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে নদীর উৎপত্তি হয়েছিল, তা নির্ণয় করা যেমন দুরূহ, তেমনি কঠিন ভাষার উৎপত্তির স্থান বা কাল নির্ণয় করা। একটি প্রাচীন ভাষা কবে, কোথায়, কার মুখে জন্ম নিয়েছিল, তা আজ আমরা নির্ণয় করতে পারি না। কোনো একটি গোষ্ঠীর মানুষের মুখের দু–চারটি শব্দ থেকে কালক্রমে সেই গোষ্ঠীর বা সমপ্রদায়ের ভাব প্রকাশের ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। এরপর একটি দল বা সমপ্রদায়ের লোকের সঙ্গে অন্য একটি দল বা সমপ্রদায়ের যখন মিশ্রণ ঘটেছে, তখন উভয়ের মুখের ভাষার মিশ্রণের ফলে তা বর্ধিত ও উন্নত হয়েছে। এভাবে উপনদীর মতো বিভিন্ন ভাষা কোনো একটি ভাষাকে পুষ্ট করে তুলেছে। আবার শাখানদীর মতো কিছু কিছু উপভাষা একটি প্রধান ভাষা থেকে নির্গত হয়ে কালক্রমে সেসব উপভাষাকে উন্নত ও বর্ধিত করে একটি দেশ বা জাতির ভাষা হয়ে গেছে। এভাবে নদীর সঙ্গে ভাষার সাদৃশ্য দেখে বলা যায় যে, ভাষা নদীর মতোই পরিবর্তনশীল; এর উৎপত্তি ও বিকাশ নদীর মতোই বিচিত্র।

শব্দসম্ভারই যেহেতু ভাষার মূল উপাদান, সেহেতু ভাষার এই শব্দগুলো কীভাবে সৃষ্টি হলো, সে সম্পর্কে জানতে পারলে ভাষা সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটিত হবে বলে মনে করি। ভাষার শব্দগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কে চারটি মতবাদ আছে। মতবাদগুলো নিম্নরূপ:

১) The Bow-wow Theory : ভাষাবিজ্ঞানীদের একদল মনে করেন যে, অনুকরণবৃত্তি থেকে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। এটাই The Bow-wow Theory নামে পরিচিত। এই দলের মতাবলম্বীরা বলেন শিশু কোনো গৃহপালিত জীবের পরিচয় দিতে গিয়ে সেই জীবের নাম উল্লেখ না করে তার ডাক অনুকরণ করে বলে ‘Bow-wow(ঘেউ–ঘেউ)’, ‘হাম্বা’, ‘মিউ’। এভাবে কুহু (Cuckoo), কেকা, টিকটিকি, শ্বাস, বাতাস, উজ্জ্বল প্রভৃতি বহু শব্দের ব্যাখ্যা করা যায়।

২। The Pooh-pooh Theory(Interjection Theory): ভাষাবিজ্ঞানীদের আরেকটি মতবাদ এই যে, মানবমনের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ–বিস্ময় প্রভৃতি অনুভূতিগুলো যখন কণ্ঠোদ্গীর্ণ ধ্বনির সাহায্যে ব্যক্ত হলো, তখন বহু বিশেষণ বা ক্রিয়াবাচক শব্দের সৃষ্টি হলো। যেমন: উঃ, আঃ, হায়, আহা, ইস ইত্যাদি।

৩। The Ding-dong Theory: এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা প্রসিদ্ধ জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার। তাঁর মতে, আদিকাল থেকেই মানুষের মধ্যে একটা স্পন্দনানুভূতি বিদ্যমান। এই স্পন্দন বিশ্বের অন্যান্য বস্তুর মধ্যেও আছে। এজন্য গতি বা স্পন্দনের অনুকরণ থেকে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। জার্মান পণ্ডিত বুচার–ও এই মত সমর্থন করতেন। পরবর্তীকালে ম্যাক্স মুলার এ মতবাদের অসারতা বুঝতে পেরে নিজেই এ মত পরিত্যাগ করেন।

৪। The Yo-he-ho Theory: এ মতবাদের প্রবর্তক নোয়ার । তাঁর মতে, আদিম মানুষ যখন সমবেতভাবে কোনো শ্রমসাধ্য কাজ করত, তখন শ্রম লাঘবের জন্য ভাবসম্পৃক্ত ধ্বনি মুখ থেকে নির্গত করত। এভাবে এই ধ্বনিসমষ্টিই হয়ে উঠল কর্ম ও ভাবের বাগ্ময় প্রকাশ তথা ভাষা।

ভাষার উৎপত্তির আধুনিক মতবাদকে ভাষাবিজ্ঞানীরা নিম্নলিখিতভাবে সাজিয়েছেন; তবে কোনো একটি মতবাদকে সর্বজনস্বীকৃত বলেননি। যেমন

(ক) অনুকরণ তত্ত্ব: মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন শব্দ অনুকরণ করে ভাষার সূচনা করেছে। (খ) আবেগ তত্ত্ব: আনন্দ, দুঃখ, বিস্ময় ও ভয়ের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়েই ভাষার উদ্ভব। (গ) সামাজিক তত্ত্ব: একসঙ্গে কাজ ও বসবাসের প্রয়োজন থেকেই ভাষার বিকাশ। বর্তমান ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক জীবন এবং প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা একত্রে ভাষার জন্ম দিয়েছে।

পৃথিবীতে বর্তমানে সাত সহস্রাধিক ভাষা প্রচলিত আছে। এ ভাষাগুলোকে কতকগুলো গোষ্ঠী বা পরিবারে বিভক্ত করা যায়। একই পর্যায়ের বিভিন্ন ভাষার মধ্যে যদি পদগঠনে এবং ব্যাকরণের অন্যান্য বিষয়ে ঐক্য থাকে কিংবা একাধিক ভাষার পূর্বতন রূপ যদি একই প্রকারের হয়, তাহলে সেই ভাষাগুলোর মধ্যে বংশগত সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। আধুনিক পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, শুধু ধ্বনিসমষ্টিতে বা পদগঠনে নয়, একাধিক ভাষার মধ্যে বাক্য গঠনরীতির সাদৃশ্য লক্ষিত হলেও সেগুলোকে সমশ্রেণিভুক্ত করা সংগত। একই প্রকারের এরূপ সুনির্দিষ্ট ধ্বনিসমষ্টি সহযোগে গঠিত ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী জনসাধারণকে ভাষা সমপ্রদায় বা ভাষাগোষ্ঠী বলে। উক্ত রীতি অনুসারে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে বিভিন্ন বর্গে শ্রেণিভুক্ত করে বংশলতিকার (এবহবধষড়মরপধষ ঞৎবব) পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ভাষাগুলোকে মুখ্য তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় (১) অসমবায়ী যেমন চীনা ভাষা; (২) যৌগিক যেমন মধ্য আফ্রিকার বান্টু গোষ্ঠীর, তুর্ক–তাতার গোষ্ঠীর ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা; (৩) সমন্বয়ী যেমন ‘সেমীয়’ অর্থাৎ আরবি, হিব্রু প্রভৃতি এবং ‘আর্য’ অর্থাৎ ল্যাটিন, ইংরেজি, সংস্কৃত, বাংলা প্রভৃতি ইউরোপ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার ভাষা।

এ ছাড়া কিছু কিছু ভাষা আছে, যেগুলো কোনো শ্রেণিতে পড়ে না, যেমন জাপানি, কোরীয় প্রভৃতি। এরূপ ভাষাকে অশ্রেণিভুক্ত ভাষা বা Unclassified Language বলা হয়।

পৃথিবীর ভাষাগুলোর পদ বা বাক্য গঠনরীতির বৈশিষ্ট্য বিচার করে যেসব ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, সেগুলোকে ১১টি সমবর্গ বা পরিবারে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। বর্গ বা পরিবারগুলো হলো–

(১) ইন্দো–ইউরোপীয়: বিশ্বের অন্যতম ভাষা পরিবার। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, রুশসহ বহু ভাষা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

(২) সেমীয়–হেমীয়: এ বর্গের উল্লেখযোগ্য দুটি ভাষা হলো আরবি ও হিব্রু। (৩) বান্টু: এ বর্গের ভাষার মধ্যে রয়েছে সোয়াহিলি, জুলু, কাফির প্রভৃতি মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার ভাষাসমূহ। (৪) ফিননো–উগরীয়: এই বর্গের ভাষা হলো ফিনিশ, এস্তোনীয় ও মাজিয়ার। (৫) তুর্ক–মঙ্গোল–মানচু: এই বর্গের ভাষা তুর্কি, তাতার, কিরগিজ, উজবেক, তুঙ্গুস, মানচু ইত্যাদি।

(৬) ককেশীয়: এ বর্গের উল্লেখযোগ্য ভাষা জর্জীয়। (৭) দ্রাবিড়: এ বর্গের উল্লেখযোগ্য ভাষা তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালম। (৮) অস্ট্রোনেশীয়: ইন্দোনেশীয়, মালয়, জাভানিজ, টাগালসহ বহু দ্বীপাঞ্চলের ভাষা এ বর্গের অন্তর্ভুক্ত। (৯) সিনো–তিব্বতী: চীনা (ম্যান্ডারিন), সিয়ামিজ, তিব্বতি, বার্মিজসহ অনেক ভাষা এ বর্গের অন্তর্ভুক্ত। (১০) উত্তর–পূর্ব সীমান্ত: উল্লেখযোগ্য ভাষা চুকচি। (১১) এস্কিমো–আদিম আমেরিকান: এ বর্গে রয়েছে আটটি ভাষাগোষ্ঠী্তআলগনকিয়ান, আথাবাসকান, ইরোকোয়িজন, মুসকোজিয়ান, সিওয়ান, পিমান, শোশোনিয়ান, নাহুয়াটলান। এই বর্গে রয়েছে ‘নাহুয়াটলান’ গোষ্ঠীর অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী অ্যাজটেক ভাষা।

মানবসভ্যতার ইতিহাস ভাষার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া, ভারত, চীন ও গ্রিসের সভ্যতা তাদের নিজস্ব ভাষা ও লিপির মাধ্যমে জ্ঞান সংরক্ষণ করেছে। আজ আমরা যে ইতিহাস জানি, তার বড় অংশই ভাষা ও লিপির কারণে সংরক্ষিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা মানবজাতির অমূল্য সম্পদ। ভাষাবৈচিত্র্য রক্ষা করা মানে মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য রক্ষা করা। মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পৃথিবীর সব ভাষাকে সংরক্ষণ ও বিকাশের উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানাই।

লেখক: জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার/সহকারী পরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত)

পূর্ববর্তী নিবন্ধহানিমুন ও সফর
পরবর্তী নিবন্ধমূল্যস্ফীতি : দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির হাতিয়ার