খাল নালা হয়ে কালো বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য পড়ছে হালদায়

দূষণের ভয়াবহতা বাড়ছে

মীর আসলাম, রাউজান | শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর দূষণ ও অবৈধ ভাবে মাছ মারা কোনো ভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। নদী পাড়ের মানুষ ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ এই মৎস্য খনিটি রক্ষায় যাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে তাদের রহস্যজনক নীরবতায় বিশেষায়িত এই নদীটি এখন বুড়িগঙ্গার মত মাছ শূন্য নদীতে পরিণত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্যবিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তারা বলেছেন, এই নদীকে দূষণমুক্ত ও মা মাছ রক্ষার গুরুদায়িত্ব রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর মৎস্য বিভাগের। সরকার এই মৎস্য ভাণ্ডারকে রক্ষায় গত দুই দশক থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজের কাজ কিছুই করা হচ্ছে না। বছরের পর বছর হালদা পাড়ের মানুষকে শুনিয়ে আসছে হালদা রক্ষায় তাদের গ্রহণ করা কথিত পরিকল্পনা মহাপরিকল্পনার কথা।

অভিযোগকারীগণ বলেছেন, এখন নদীর পানি দূষণ ও অবৈধ ভাবে মাছ মারা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে নদী দূষণকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ না নেয়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন শিল্পবর্জ্য নদীতে ছাড়া হচ্ছে। মাছ চোররা নানা কায়দায় চুরি করছে নদীর মা মাছ।

গতকাল ২৭ অক্টোবর নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করতে গিয়ে নদীর পানি দূষণের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। গাঢ় কালো চিকচিকে বিষাক্ত পানি স্রোত হয়ে হালদায় এসে পড়ছে নগরের বিভিন্নস্থানে থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে। স্থানীয়রা জানান, মোহরা শিল্প এলাকায় থাকা বেশির ভাগ বর্জ্য খাল নালা হয়ে এসে পড়ছে কৃষ্ণ খালী খালে। এই খালে যুক্ত হচ্ছে অক্সিজেনসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় থাকা ছোট বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও। অনেকেই অভিযোগ করে বলেছেন, মোহরার চামড়া শিল্প কারখানা থেকে ছেড়ে দেয়া বিষাক্ত বর্জ্য খালের পানির সাথে গড়িয়ে যাচ্ছে বুড়িশ্চর এলাকার কৃষিজমির উপর দিয়ে। বিষাক্ত পানির কারণে এখানকার কৃষিজমিতে চাষাবাদ হচ্ছে না অনেক বছর ধরে। এই পানি যেদিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সেই দিকে কোনো পোকা মাকড়ের অস্তিত্ব দেখা যায় না।

পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বুড়িশ্চর নজুমিয়া হাট এলাকায় কাপ্তাই সড়কের নিচে দিয়ে রয়েছে একটি কালভার্ট। শেখ মার্কেটের সামনের এই কালভার্টের নিচ দিয়ে স্রোত হয়ে নামছে বুড়িশ্চরের বিভিন্ন খাল নাল হয়ে ঘুরে আসা কৃষ্ণখালীর ওই বিষাক্ত পানি। আবু সৈয়দ নামের স্থানীয় একজন বলেছেন, কালভার্টের নিচে দিয়ে আসা এই কালো পানি ছোট খালে গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে।

হালদা রক্ষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হালদাপাড় মদুনাঘাট বাজারের ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, নানা কৌশলে নদীতে মাছ চোরেরা সক্রিয়। আগের চাইতে এখন মাছ চোরের উপদ্রপ বেড়েছে বলে এই ব্যবসায়ীর দাবি। তিনি ক্ষোভ হতাশা প্রকাশ করে বলেন, প্রাকৃতিক এই মৎস্য ভাণ্ডারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় সরকার নানা কর্মসূচির আওতায় গত দুই দশকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সরকারের বরাদ্দ দেয়া এত টাকা কোন খাতে কারা কীভাবে, কোথায় খরচ করা হচ্ছে তার বাস্তবতা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

প্রবীর বড়ুয়া নামে একজন মৎস্যজীবী অভিযোগ করে বলেছেন, গত বছর সরকারের মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, হাটহাজারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল হালদা পাড়ে এসেছিলেন। তারা এই মৎস্য ভাণ্ডারকে ধংসের হাত থেকে রক্ষায় করণীয় কি হতে পারে এ বিষয়ে নদীর পাড়ের মানুষের কাছ থেকে শুনেছেন। ওই অনুষ্ঠানে হালদা পাড়ের মানুষের প্রধান দাবি ছিল নদীটিকে দূষণমুক্ত করা ও মাছ চোরদের তৎপরতারোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার। ওই সমাবেশে প্রতিমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন র্স্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে নদীতে মাছ চোরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য দুটি স্পিড বোট দেবেন। বিশেষ টিম গঠন করে দূষণের উৎসব চিহ্নিত করার মাধ্যমে নদীর পানিকে দূষণমুক্ত করবেন। অথচ গত এক বছরেও প্রতিমন্ত্রীর এসব ঘোষণার বাস্তবায়ন করা হয়নি।

খবর নিয়ে জানা যায়, গতকয়েক দিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি টিম মোহরা শিল্প এলাকা পরিদর্শন করে খাল নালায় শিল্পবর্জ্য এসে পড়ার ভয়াবহ চিত্র দেখে গেছেন। ওই টিমের সাথে ছিলেন চট্টগ্রামের হালদা রক্ষা কমিটির শীর্ষ নেতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া। এই গবেষকের সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তাদের পরিদর্শনে দেখা বর্জ্য ফেলার উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শন টিম নিজেরা এই ভয়াবহতার চিত্র স্বচক্ষে দেখে গেছেন। এখন অপেক্ষা করতে হবে এ ব্যাপারে তারা কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এই গবেষক বলেন, আমরা বহু বছর থেকে নদীর পানি দূষণমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছি। কোথা থেকে, কোন পথে নদীতে বিষাক্ত পানি এসে মিশে যাচ্ছে তাও চিহ্নিত করে দিতে সহযোগিতা করেছি। আমাদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে হালদাকে রক্ষায় করণীয় নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দফায় দফায় সুপারিশ তুলে ধরেছি। এ সব সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে আমরা এর বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। এটি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, হালদা নদীকে বাঁচাতে হলে সর্বপ্রথম নদীর পানি দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, চুরি করে মা–মাছ শিকার, নদীর উজানে রাবার ড্যাম অপসারণ, তামাকের চাষ, নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলেই আমাদের প্রাকৃতিক এই মৎস্যভাণ্ডারকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে টেকসই ও যুগোপযোগী করতে চাই
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬