রেলসেতুর পিলারের গোড়ায় গর্ত করে বালু উত্তোলন

ঝুঁকিতে নবগঠিত পহরচাঁদা ইউনিয়ন অংশের রেললাইন মাতামুহুরী নদীর অর্ধশতাধিক স্থানে বালু উত্তোলন

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবহমান মাতামুহুরী নদীর অন্তত অর্ধ শতাধিক স্থান থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইনের সেতুর নিচ থেকে এবং পাদদেশের ফসলি জমি বিশাল গর্ত করে শ্যালোমেশিনে দিনরাত সমানে তোলা হচ্ছে বালু। এতে রেলসেতুর গোড়ার মাটি সরে গিয়ে ধসে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যেকোনো মুহূর্তে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সরজমিন দেখা গেছে, মাতামুহুরী নদী ছাড়াও চকরিয়া উপজেলার নবগঠিত পহরচাঁদা ইউনিয়নে রেলসেতু ও প্রতিরক্ষা বাঁধ কাম সরকারি সড়ক ঘেঁষে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। আর সেই স্থানকে অবৈধ বালুর ডিপো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর উত্তোলিত বালু প্রতিদিন অসংখ্য ডাম্পার ও ট্রাকে করে অন্যত্র পাচার করা হচ্ছে। এতে করে সরকারি সড়কসহ গ্রামীণ অবকাঠামো লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে– মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অংশে এবং পহরচাঁদায় রেলসেতুর নিচ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে জড়িতদের লাগাম টানার কেউ নেই প্রশাসনিকভাবে। যারা এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন তারা সরকারি দলের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় স্থানীয় এবং ফসলি জমির মালিকেরা তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলারও সাহস পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় মাতামুহুরী নদী এবং বিভিন্ন শাখা–প্রশাখা খালে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে মাসের পর মাস অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পহরচাঁদা এলাকার সচেতন একাধিক ব্যক্তি দৈনিক আজাদীকে বলেন, চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন থেকে পৃথক করে নবসৃষ্ট পহরচাঁদা ইউনিয়নের পশ্চিম পাড়ার ভেতর দিয়ে চলমান রেললাইনের নিচে প্রবাহিত পার্বত্য অববাহিকার হারবাং ছড়া খালে এবং আশপাশের ফসলি জমিতে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে ভূ–গর্ভ থেকে বালু উত্তোলনে অন্তত ২০ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা দিনরাত লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে পাহারায় রেখে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। পরিবেশ বিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় মিনহাজ উদ্দিন ও কবির আহমদ। কিন্তু তাদের এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয় লোকজন ও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সম্প্রতি তাদের ওপর হামলা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রেলসেতুর পিলারের গোড়া থেকে অনবরত ভূ–গর্ভের বালু উত্তোলনের কারণে ব্রিজের মূল কাঠামোর নিচের মাটি সরে গিয়ে সেখানে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাজার হাজার টন ওজনের রেল চলাচলের সময় যে কম্পন ও চাপ নেওয়ার ক্ষমতা সেতুটির থাকে তার ভারসাম্য থাকছে না। এমনকি পিলারের গোড়া উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়াও বড় ধরনের দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হারবাং ছড়ার ওপর দিয়ে চলমান রেলসেতুর পিলারের একেবারে কাছ থেকে এবং আশপাশের ফসলি জমি থেকে ভূ–গর্ভের বালু তুলে ফেলা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোরশেদ আলম। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, দিনরাত শ্যালোমেশিন ও ড্রেজারে সেতুর পিলারের গোড়া থেকে বালু তোলার কারণে রেলসেতুটি যেমন ঝুঁকিতে পড়েছে তেমনি আমাদের ঘরবাড়ি ও চাষের জমিও বিলীন হবে। অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু দিনরাত সমানে অসংখ্য ডাম্পার দিয়ে পরিবহন করার চলাচলের সড়কগুলোও লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বালু তোলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

তবে পহরচাঁদায় ছড়া খালের ওপর চলমান রেলসেতুর নিচ থেকে ও ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা নিয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন মিনহাজ উদ্দিন। তিনি বলেন, আমরা বালু তুলতেছি মাতামুহুরী নদী থেকে। ছড়া খাল থেকে আগে তোলা হলেও এখন বন্ধ রয়েছে।

মাতামুহুরী নদী ও বিভিন্ন ছড়া থেকে অবৈধভাবে ভূ–গর্ভের বালু তুলে ফেলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, গুটিকয়েক লোকজনের পকেট ভারী করার জন্য অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকায় নির্মিত রেললাইন এবং মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে প্রশাসনকে। তা না হলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে, যদি সময়মতো এনিয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়।

মাতামুহুরী নদীর অর্ধ শতাধিক স্থান, বিভিন্ন ছড়া খালসহ রেলসেতুর নিচ থেকে বালু তোলা নিয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিউল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, অবৈধভাবে বালু তোলা নিয়ে খবর পেলেই অভিযান চালিয়ে বালু তোলার যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জব্দসহ ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এর পরও যারা সরকারি আদেশ মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমিয়ানমারে ৪০ হাজার কেজি সিমেন্ট পাচারের চেষ্টা
পরবর্তী নিবন্ধপটিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে নারীর মৃত্যু