বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়েছেন। এখন পর্যন্ত তাদের সদস্যপদ সক্রিয়ও রয়েছে। এমন অবস্থায় অন্য পেশায় রয়েছেন, চাকরি করছেন, দেশে–বিদেশে থেকে ব্যবসা করছেন–এমন ২০ জনকে শোকজ করা হয়েছে। সম্প্রতি এসব নন প্র্যাকটিশনারদেরকে শোকজ করে কারণ দর্শাতে বলেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরো ১০০ থেকে ২০০ জনকে শোকজ করে জবাব চাওয়া হবে বলে সমিতির সূত্র দৈনিক আজাদীকে নিশ্চিত করেছেন। এদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো বিচারক রয়েছেন। যারা দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত রয়েছেন। ইতিমধ্যে যে ২০ জন আইনজীবীকে শোকজ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনজুর কাদের ভূঁইয়ার নামও রয়েছে। তার লিন নম্বর ২০০২১০১৫২৮। তিনি ফেনী জেলার মাদ্রাসা রোডের বাসিন্দা।
সমিতি সূত্র জানায়, পুলিশ বাহিনী ছাড়াও তালিকার বাকীরা ব্যাংক, বন্দর, এনজিও, লিমিটেড কোম্পানী, বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি কর্পোরেশন ও স্কুলে চাকরি করছেন। কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ডে ও লন্ডনে থেকে ব্যবসা কিংবা চাকরি করছেন। তাদের কেউ–ই আইনজীবী সনদ স্থগিত করেননি।
সমিতি সূত্র জানায়, সরাইল থানার ওসি লিন স্থগিত চেয়ে একটি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটি প্রসিডিউর মেনে হয়নি। প্রসিডিউর হচ্ছে– বার কাউন্সিলের নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করা। এছাড়া সরাইল থানার ওসি সম্প্রতি বকেয়াও পরিশোধ করেছেন। যদি তিনি স্থগিত করে থাকেন, তাহলে বকেয়া আসলো কোথা থেকে? সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, শোকজের পর সরাইল থানার ওসি আমাদের একজন আইনজীবীকে তার সদস্যপদ স্থগিত চেয়ে করা একটি ডকুমেন্ট পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমরা বলেছি যে, জবাব দাখিল করার জন্য। তিনি বলেন, নন প্র্যাকটিশনার বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। যারা নন প্র্যাকটিশনার তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমাদের কাজ চলমান। তিনি জানান, এর আগে আরো বেশ কিছু আইনজীবীকে শোকজ করা হয়েছিল। অনেকে ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। সে সময় অনেকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
গত ২২ অক্টোবর রাতে সরাইল থানায় গিয়ে ওসি মনজুর কাদেরের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনটি সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ নিয়ে গঠিত। রুমিনের সঙ্গে ওসির এই বাদানুবাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিতে মনজুর কাদের ভুঁইয়ার সদস্য পদ থাকার বিষয়টি নজরে আসে।
আইন পেশা ছাড়া চাকরি বা ব্যবসা কিংবা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীদের বিষয়ে আইনবিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে গত ২৬ অক্টোবর রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত বা সতর্কতা কমিটি গঠনের পাশাপাশি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ওই বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির চেয়ারম্যানদের প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্বৈত পেশা বা ব্যবসায় নিয়োজিত আইনজীবী যদি সনদ বা লাইসেন্স সমর্পণ না করেন, এ ধরনের পেশা বা ব্যবসা পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা বা সতর্কবার্তা দিতে হবে। এ নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার আরজিও রয়েছে রিটে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূইয়া আবেদনকারী হয়ে রিট আবেদনটি করেছেন। এর আগে যারা আইন পেশার সনদ নিয়ে আইন পেশা ছাড়া চাকরি/ব্যবসা ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭২ বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল আদেশের ৭০ অনুচ্ছেদ ও আচরণবিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর আবেদন দেন রিট আবেদনকারী। আবেদনে ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূইয়া উল্লেখ করেন, ‘আইন পেশা একটি মহান ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে এ পেশার মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখা। আইনজীবীদের অনেকেই আইন পেশার সনদপ্রাপ্ত হয়ে আইন পেশার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা–বাণিজ্য, চাকরি, ঠিকাদারি, আদম ব্যবসা, গাড়ির শোরুম, বিদেশে অবস্থান করে চাকরি, পরিবহন ব্যবসা, ইট, বালু, সিমেন্টের ব্যবসা, মোবাইলের ফ্লেঙিলোড ও বিকাশ এজেন্টের দোকান এবং কেউ কেউ আইন পেশার সনদ সারেন্ডার (সমর্পণ) না করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক/প্রতিষ্ঠান, বিমা, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, ওষুধের ফার্মেসি, মুঠোফোন সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইম বা পার্ট টাইম চাকরি করছেন বলে জানতে পেরেছেন, যা বার কাউন্সিল আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘিত হওয়ায় আইন পেশার মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে।’ এতে ফল না পেয়ে গত ১২ আগস্ট বার কাউন্সিলের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির চেয়ারম্যানদের বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। এ অবস্থায় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি করা আবেদন নিষ্পত্তিতে নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে রিটটি করেছেন বলে জানান আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূইয়া।










