চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ‘আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার’ বা ‘ফুড সেফটি ল্যাব’। ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের বিবিরহাটে স্থাপিত এ ল্যাবে রয়েছে খাদ্যের ভেজাল শনাক্ত ও গুণাগুণ নির্ণয়ের নানা যন্ত্রপাতি। ল্যাবের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। একই বছর চসিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় এ ল্যাবে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন দেয়। এরপর ২০১৭ সাল থেকে বেশ কিছুদিন পরীক্ষামূলকভাবে ল্যাবটিতে বিভিন্ন খাদ্যের নমুনা পরীক্ষাও করা হয়। পরবর্তীতে জনবল সংকটে বন্ধ হয়ে যায় ল্যাবের কার্যক্রম।
এমন পরিস্থিতিতে চসিকের উদ্যোগে আগামী মাসে চালু হচ্ছে ল্যাবটি। এ জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে জনবলও। পুরোদমে ল্যাবটি চালু হলে এর সুফল পাবে চট্টগ্রামবাসী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষাগারটিতে চট্টগ্রাম শহরের খাদ্য সামগ্রীর সম্ভাব্য সব ধরণের ভৌত, রাসায়নিক ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল গুণমানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টি প্যারামিটার পরীক্ষা করা যাবে। এছাড়া চট্টগ্রাম এলাকায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার খাদ্য সামগ্রী এবং আমদানি ও রপ্তানিযোগ্য খাদ্য সামগ্রীর গুণমান পরীক্ষা করা হবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ইম্প্রুভমেভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস (আইইউপিইএইচপিএস) প্রকল্পের আওতায় ল্যাবটি নির্মাণ করা হয়। এতে অর্থায়ন করে এডিবি। একই প্রকল্পের অধীন ঢাকায়ও একটি ফুড ল্যাব নির্মাণ করা হয়েছে। ৮ হাজার বর্গফুটের অবকাঠামোগত কাজ শেষে চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগারটিতে স্থাপন করা হয়েছে ৬টি আধুনিক ল্যাব। এরপর খাদ্যের ভেজাল শনাক্ত ও গুণাগুণ নির্ণয়ে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ৮২টি যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। এর আগে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ল্যাবটির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছিল।
চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, ফুড সেফটি ল্যাব সঠিকভাবে পরিচালিত হলে চট্টগ্রামবাসীর খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি এটি রাজস্ব আয়ের একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
যে কারণে বন্ধ ছিল ল্যাবের কার্যক্রম : ২০১৬ সালে ল্যাবটিতে নিয়োগে জনবল কাঠামোর একটি অর্গানোগ্রাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় চসিক। এতে পরিচালকসহ ২৩ পদে ৩৪ জন কর্মকর্তা–কর্মচারির অনুমোদন চাওয়া হয়। এর ৫ বছর পর ২০২১ সালের জুনে সাত ক্যাটাগরিতে ৮টি পদ সৃজনে সম্মতি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। যার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
অবশ্য নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ‘পরিচালক’ ছাড়া কয়েকটি পদে অস্থায়ী জনবল নিয়োগ দেয়। স্থায়ী না হওয়ায় এবং বেতন–ভাতা নিয়মিত না হওয়ায় নিয়োজিতরা অন্যত্র চলে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় ল্যাবটি। এরপর ল্যাবের অবকাঠামো নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘স্টার্লিং মাল্টি টেকনোলজি’ ল্যাবটির তত্ত্বাবধানে ছিল ল্যাবটি। গতবছর তাদের থেকে ল্যাবটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় চসিক। এরপর ল্যাবটি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়।
অবশেষে জনবল নিয়োগ : গত ২৬ অক্টোবর ল্যাবটি পরিচালনার লক্ষ্যে আউটসোর্সিং জনবল হিসেবে চার ক্যাটাগরির পদের বিপরীতে ৭ কর্মকর্তা–কর্মচারীকে ন্যস্ত করে অফিস আদেশ জারি করেন ইম্প্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস (আইইউপিইএইচপিএস) প্রকল্পের পরিচালক। এর মধ্যে একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট, দুইজন ল্যাব সহকারী, একজন অফিস সহকারী ও তিনজন ভেক্টর কালেক্টর। ন্যস্তকৃতদের মধ্যে দুই (মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও অফিস সহকারী) বর্তমানে চসিকে কর্মরত। বাকিরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত আছেন।
এর আগে গত ২৫ অক্টোবর ইম্প্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রকল্প পরিচালকের কাছে দাপ্তরিক পত্র দেয় চসিক। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন স্বাক্ষরিত ল্যাবটি পরিপূর্ণভাবে চালুর লক্ষ্যে পরিচালকসহ ১৪ ক্যাটাগারির পদের বিপরীতে ২৩ জন জনবল নিয়োগ দিতে বলা হয়। এ চিঠির প্রেক্ষিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৭ জনকে ন্যস্ত করা হয়।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, যে ৭ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আগামী রোববার থেকে তাদের এক সপ্তাহের ট্রেনিং দেয়া হবে। এরপর ল্যাবটি চালু করা হবে। আশা করছি নভেম্বর মাসে দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি চালু করতে পারব।
চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানা আজাদীকে বলেন, ২০২১ সালে ৮টি পদ সৃজন করা হলেও তা পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে যায়। ফলে আর জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।
যা পরীক্ষা করা যাবে : ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল ল্যাবটিতে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করে চসিক। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর ‘মান রক্ষা করা, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও তার রক্ষণাবেক্ষনের ব্যবস্থা করা’ এই তিন শর্তে পরীক্ষার অনুমোদন দেয় চসিককে।
ল্যাব সূত্রে জানা যায়, আধুনিক এই পরীক্ষাগারে ফলমূল ছাড়াও দুধ ও দুধ জাতীয় পণ্য, মিষ্টি ও মিষ্টি জাতীয় পণ্য, কার্বনাটেজ ভেবারেজ, জুস জাতীয় পণ্য, ড্রিংকিং ওয়াটার, সস জাতীয় পণ্য, মশলা পণ্য, স্নেকস্ ফুড, বেকারি পণ্য, আইসক্রিম, ড্রাই স্যুপ, নুডলস, পাস্তা, আটা, ময়দা, সুজিসহ বিভিন্ন খাদ্য পরীক্ষা করে এর মান যাচাই করা যাবে। এছাড়া এই ল্যাবে ফাস্টফুড, গুড়া মসলা, ভোজ্যতেল এবং তেলজাত পণ্য, মাছ–মাংস, এবং শুঁটকি, ফল–ফলাদী ও সবজিজাত পণ্য, শস্য এবং শস্যজাত পণ্য, বেকারি পণ্য, আচার–চাটনী, জ্যাম–জেলী, চকলেট এবং পানি ও কোমল পানিও ইত্যাদিসহ আরো অনেক ধরণের খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার যে কোন সময় যে কোন খাদ্য এই পরীক্ষাগারে নিয়ে পরীক্ষা করতে পারবে। উন্নত যন্ত্রপাতি আর দক্ষ জনবল সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক এই খাদ্যপরীক্ষাগারটির পরীক্ষাকৃত টেস্টের মান আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রন সংস্থা (আইএসও) এর ন্যায়। যে কোন প্রকার খাদ্য ও খাদ্য জাত দ্রব্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর উক্তখাদ্য বিশ্বের সব দেশে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত হবে।












