খেলার মাঠে মেয়েদের জায়গা

প্রজ্ঞা নাসরিন | শনিবার , ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ

বিকেলের মাঠ। এক পাশে কয়েকজন ছেলে ফুটবল খেলছে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ চিৎকার করে বল চাইছে। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি মেয়ে খেলা দেখছে। তাদেরও হয়তো খেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেই ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা হিসাব–বাড়ি ফিরতে দেরি হবে কি না, পোশাক নিয়ে কেউ কিছু বলবে কি না, মাঠে খেলতে গেলে অন্যরা কী ভাববে। ছেলেদের জন্য যে মাঠ প্রতিদিনের স্বাভাবিক জায়গা, অনেক মেয়ের জন্য সেটি এখনো অনুমতি ও সংকোচের বিষয়। বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও খেলাধুলার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে কৈশোরে পৌঁছানোর পর অনেক মেয়ের মাঠে যাওয়া কমে আসে। ছোটবেলায় যে মেয়েটি ভাইয়ের সঙ্গে দৌড়েছে, খেলেছে, সাইকেল চালিয়েছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চলাফেরায় নানা শর্ত যুক্ত হয়। অথচ একই বয়সে ছেলেদের খেলাধুলাকে স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় বলেই মনে করা হয়।

এই বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে অক্টোবর মাসে। ৮ অক্টোবর ঢাকার লালমাটিয়া গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মেয়েদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বেশি সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। দাবা, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল ও ক্রিকেটের মতো খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত মাঠ, প্রশিক্ষণ, কোচিং ও সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

একই মাসের ১৯ তারিখ ঢাকার মিরপুরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কিশোরীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিসরে সমান সুযোগের দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেই আলোচনায় উঠে এসেছে মেয়েদের সামনে থাকা নানা সামাজিক বাধার কথা। এসব দাবির সঙ্গে খেলাধুলার সম্পর্কও গভীর। কারণ মাঠ কেবল শরীরচর্চার জায়গা নয়; এটি মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, দলগত কাজ এবং নিজের সক্ষমতা আবিষ্কারেরও একটি পরিসর। একটি শিশু যখন মাঠে খেলতে নামে, তখন সে শুধু কোনো খেলার নিয়ম শেখে না। সে শেখে কীভাবে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, কীভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয়, আবার নতুন করে চেষ্টা করতে হয়। কখনো নেতৃত্ব দেয়, কখনো অন্যের নেতৃত্ব অনুসরণ করে। নিজের শরীরের শক্তি, গতি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। এসব অভিজ্ঞতা মেয়েদের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত। জাতীয় পর্যায়ে কোনো নারী খেলোয়াড় সাফল্য অর্জন করলে তাঁকে অভিনন্দন জানানো হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নারী ফুটবলার বা ক্রিকেটারদের অর্জন দেশের গৌরব হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়। অথচ সেই খেলোয়াড়দের মতো হয়ে ওঠার সুযোগ পাড়ার কিংবা গ্রামের সাধারণ মেয়েদের কতটা দেওয়া হয়, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম।

এই দ্বৈততা লক্ষ করার মতো। আমরা সফল নারী খেলোয়াড় চাই, কিন্তু সব মেয়ের জন্য খেলার পরিবেশ তৈরির বিষয়ে সমান মনোযোগ দিই না। কোনো মেয়ে খেলাধুলায় ভালো করলে তাকে উৎসাহিত করা হতে পারে, কিন্তু তার আগে মাঠে নামার সুযোগটুকুই যদি না থাকে, তাহলে প্রতিভা প্রকাশ পাবে কীভাবে?

খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণের বাধা শুধু পরিবারের নিষেধাজ্ঞা নয়। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মাঠ নেই। কোথাও মাঠ থাকলেও ছেলেদের খেলার সময় ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মেয়েদের জন্য আলাদা পোশাক পরিবর্তনের জায়গা, নিরাপদ শৌচাগার কিংবা প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী না থাকাও সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার নারী প্রশিক্ষকের অভাব কিংবা বিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রমের অনুপস্থিতি মেয়েদের অংশগ্রহণ সীমিত করে।

বিশেষত কৈশোরে শারীরিক পরিবর্তনের সময় মেয়েদের খেলাধুলা থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। মাসিকের সময় খেলাধুলা করা নিয়ে ভুল ধারণা, উপযুক্ত পোশাকের অভাব কিংবা নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি অনেক মেয়েকে মাঠ থেকে দূরে রাখতে পারে। অথচ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ মেয়েই মাসিকের সময়ও নিজের সক্ষমতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারে।

মেয়েদের জন্য নিরাপদ মাঠের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের অনেক উন্মুক্ত মাঠে কিশোরী ও নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, কটূক্তি কিংবা বিরক্তিকর দৃষ্টির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে মেয়েদের পরিবার নিরাপত্তার কথা ভেবে বাইরে খেলতে নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে মেয়েদের মাঠ থেকে সরিয়ে রাখলে বৈষম্য আরও স্থায়ী হয়।

এই জায়গায় স্থানীয় সরকার, বিদ্যালয় এবং পরিবার–তিন পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। একটি মাঠ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেখানে মেয়েরা স্বচ্ছন্দে খেলতে পারছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। মাঠের সময়সূচি, আলো, নিরাপত্তা, শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রমে মেয়েদের অংশগ্রহণকে ব্যতিক্রম নয়, নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। ৮ অক্টোবর সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি খেলার মাঠ এবং দুই মাসের মধ্যে এক হাজার মাঠ স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিশু–কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে মাঠগুলো কাদের ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মাঠ যদি আবার শুধু ছেলেদের দখলে চলে যায়, তাহলে মেয়েদের সুযোগের বৈষম্য অটুট থাকবে।

গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সম্পর্কও রয়েছে। একসময় পাড়ায় পাড়ায় মেয়েদের গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, এক্কাদোক্কা কিংবা বিভিন্ন দলীয় খেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। নগরায়ণ, বসতির ঘনত্ব, খোলা জায়গার সংকট এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনে এসব খেলার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ফলে খেলাধুলা নিয়ে পরিকল্পনা করার সময় আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক খেলার পাশাপাশি স্থানীয় খেলাধুলার ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

তবে সব মেয়েকে পেশাদার খেলোয়াড় হতে হবে, এমন নয়। খেলাধুলার অধিকারকে কেবল জাতীয় দলের জন্য প্রতিভা খোঁজার মাধ্যম হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। যে মেয়ে জীবনে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না, তারও দৌড়ানোর, সাইকেল চালানোর, ফুটবল খেলার কিংবা বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে সময় কাটানোর অধিকার রয়েছে।

এখানে অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের পড়াশোনা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উদ্বেগ যদি তার সব ধরনের শারীরিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে, তাহলে আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও কমে যায়। মেয়েদের খেলাধুলাকে সময়ের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় শখ হিসেবে না দেখে বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

খেলার মাঠ আসলে একটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিচয় দেয়। সেখানে কারা সহজে প্রবেশ করতে পারে, কারা নিজের শরীর নিয়ে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে এবং কাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক মনে করা হয়–এসবের মধ্যেই সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক প্রকাশ পায়। একটি মেয়ে যখন মাঠে দৌড়ায়, সে কি আসলে শুধ ুএকটি বলের পেছনে ছোটে? সে নিজের শরীরের ওপর আস্থা অর্জন করে, প্রকাশ্যে জায়গা নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে এবং অন্যদের সঙ্গে সমানভাবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা পায়।

মেয়েদের জন্য খেলার মাঠ নিশ্চিত করা তাই কেবল ক্রীড়া উন্নয়নের প্রশ্ন নয়। এটি তাদের শৈশব, কৈশোর, স্বাস্থ্য এবং জনপরিসরে সমান উপস্থিতির অধিকার প্রতিষ্ঠারও অংশ। মাঠের সীমানা সবার জন্য একই হলেও সেখানে প্রবেশের স্বাধীনতা এখনো সবার সমান নয়। সেই ব্যবধান ঘোচানোই হওয়া উচিত নতুন উদ্যোগগুলোর অন্যতম লক্ষ্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারীর স্বাস্থ্যসেবায় বড় বিনিয়োগ, চিকিৎসা পৌঁছাবে কতদূর
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় আ’লা হযরত সুন্নী পরিষদের তাজেদারে মদিনা কনফারেন্স