কিশোর গ্যাং এখন ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। সমপ্রতি সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা হু হু করে বেড়ে চলেছে। বর্তমানে কিশোর গ্যাং শহর থেকে গ্রাম, পাড়া–মহল্লায়, অলিতে–গলিতে সর্বত্র গড়ে উঠছে আশঙ্কাজনক হারে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, শুধু রাজধানীতে ঢাকাতেই ৫২টি সক্রিয় ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপ এবং ৭০০ জন ‘কিশোর গ্যাং’ সদস্য রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় সমগ্র দেশের চিত্র কতটা ভয়াবহ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালান, অপহরণ, যৌন হয়রানি, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি থেকে শুরু করে গুম–খুনের মতো ঘৃণ্য অপরাধে কিশোরেরা জড়িয়ে যাচ্ছে প্রায়শই। বর্তমানে কিশোর গ্যাং শুধু অভিভাবকদের জন্যই আতঙ্ক নয়; বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চট্টগ্রামে এই অপরাধে মামলা আড়াই হাজার ছাড়াল। গত ১৩ অক্টোবর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে আইনের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রামের ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের গত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান থেকে মিলেছে এ তথ্য। চট্টগ্রাম জেলায় আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশু–কিশোরদের বিচার এসব ট্রাইব্যুনালেই হয়ে থাকে। ট্রাইব্যুনালগুলোর সার্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেখানে মোট ৭ হাজার ৫৬৮টি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে শিশু মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪১ টিতে। এতে আরো বলা হয়, আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চট্টগ্রামের ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৫৮৬ টি, এরমধ্যে ২ হাজার ৬৪১ টি শিশু মামলা। ট্রাইব্যুনাল–১ এ ৭৫০ টি শিশু মামলাসহ মোট মামলা রয়েছে ২ হাজার ৮৫০টি, ট্রাইব্যুনাল–২ তে ২৮০ টি শিশু মামলাসহ মোট মামলা রয়েছে ৭৮৪ টি, ট্রাইব্যুনাল–৩ তে ২৫৩ টি শিশু মামলাসহ ৯১৫ টি, ট্রাইব্যুনাল–৪ এ ৪৭০ টি শিশু মামলাসহ ১ হাজার ১৯৪ টি, ট্রাইব্যুনাল–৫ এ ৩৫৬ টি শিশু মামলাসহ ১ হাজার ২৯ টি, ট্রাইব্যুনাল–৬ এ ৩৫১ টি শিশু মামলাসহ ৭৭১ টি ও ট্রাইব্যুনাল–৭ এ ১৮১ টি শিশু মামলাসহ মোট বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৫২৯ টি।
এই চিত্র উদ্বেগজনক। কেন শিশুকিশোররা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। কেন এবং কীভাবে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমাজব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুত্ব, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের নানা বিরুদ্ধ–উপকরণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং। তা ছাড়া অপরাধমূলক মানসিকতা, দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিত্ব, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা, অনুকরণপ্রবণতা, অল্প বয়সে যৌন আসক্তি বা যৌন আসক্ত হওয়ার ক্ষেত্র ও সুযোগ থেকেও কিশোর গ্যাং গড়ে উঠতে পারে। তাঁরা মনে করেন, মাদকাসক্তি, দারিদ্র্য, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, পরিবারিক সমস্যা, হতাশা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব–এই কারণগুলোই মূলত কিশোর গ্যাংসমূহ গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী। মূল কারণগুলো ছাড়াও আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। যেমন–শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাবে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে। ফলে কিশোরেরা পারিবারিক অনুশাসনে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া কেউ কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে এবং এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করছে নানা সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির বলেন, বিচারাধীন এসব মামলার একটি বড় অংশে রয়েছে মারামারি, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘাত, চুরি বা মাদক সংক্রান্ত অপরাধ। এর পেছনে কিশোর গ্যাং কালচার, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের দায় রয়েছে। এ অঞ্চলে শিশু মামলা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য সমাজব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শৈথিল্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মনে রাখতে হবে, কিশোর অপরাধ দমনের অর্থ কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং আরেকজন কিশোরকে অপরাধের পথে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনা। কিশোরেরা দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। তাদের একটি অংশ যদি অপরাধের জালে আটকে পড়ে, তবে তার দায় শুধু তাদের একার নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাষ্ট্র– সব পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে অপরাধের সঙ্গে আপস করা যাবে না, আবার পথভ্রষ্ট কিশোরদের ফিরিয়ে আনার সুযোগও বন্ধ করা যাবে না। অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদের দমন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং কিশোরদের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা ও কর্মমুখী বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।








